‘আব্বায় বকছে, এরপর চাকরির জন্য ঢাকা গেছে’

ঢাকার পান্থপথের হোটেলে নিহত ‘জঙ্গি’ সাইফুল ইসলামের বোনের দাবি, বাবার বকা খেয়ে সাইফুল ঢাকায় চাকরি খুঁজতে যান।

খুলনার ডুমুরিয়ায় সাহস ইউনিয়নের নওকাটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন সাইফুল ইসলাম। তাঁর বাবা আবুল খায়ের মোল্লা স্থানীয় মসজিদের ইমাম। আজ মঙ্গলবার সকালে পান্থপথে স্কয়ার হাসপাতালের পাশে ওলিও ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি আবাসিক হোটেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘অপারেশন অগাস্ট বাইট’ অভিযানের সময় ‘আত্মঘাতী’ বিস্ফোরণে নিহত হন সাইফুল।

সাইফুলের বোন ইরানি সাবিহা জানান, গত শুক্রবার দুপুরে সাইফুল গ্রামের মসজিদে জুমার নামাজ পড়ে আসার পর বাবা আবুল খায়ের তাঁকে চাকরির জন্য ভর্ৎসনা করেন। এরপর সাইফুল বিকেলে চাকরির জন্য ঢাকা যাচ্ছেন বলে জানান।

সাবিহা বলেন, ‘শুক্রবারে আব্বায় বকছে, এরপর চাকরির জন্য ঢাকা গেছে। আমি ভাইয়ের কথা শুনে ফোন দিছি আব্বার কাছে, আব্বা বলল আমি থানায়। ১০টার দিকে ফোন দিছি আমি।’ এ সময় তাঁকে ভাইয়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ভাইয়া খুব ভালো। ওই সব কথা কোনোদিনও শুনিনি।’

ইরানি সাবিহা আরো জানান, তাঁদের মা বাকপ্রতিবন্ধী। তাঁর দুই বোনও মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন।

এদিকে, সাইফুলের চাচা আবদুর রউফ বলেন, ‘সে (সাইফুল) জঙ্গি নয়, ভালো ছেলে। এটা ভুল হয়েছে। গত শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ে চাকরির জন্য সাইফুল ঢাকায় গেছে।’

নওকাটি এলাকার মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেন বলেন, ‘ছেলেটি ভালো। তাঁর আচরণে জঙ্গি বলে মনে হয়নি।’

এদিকে আজ মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ইউনিয়নের নওকাটি গ্রাম থেকে সাইফুলের বাবা আবুল খায়েরকে আটক করা হয়। এরপর দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন খুলনার পুলিশ সুপার (এসপি) নিজাম উদ্দিন মোল্লা।

এসপি নিজাম জানান, নিহত জঙ্গি সাইফুলের সম্পর্কে তথ্য জানতে তাঁর বাবা আবুল খায়েরকে আটক করা হয়েছিল। আটকের পর এসপি জানিয়েছিলেন সাইফুলের বাবা সাহস ইউনিয়ন জামায়াতের কোষাধ্যক্ষ ও নওকাটি জামে মসজিদের ইমাম।

এর আগে আজ সকালে রাজধানীর পান্থপথে আবাসিক হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘অপারেশন অগাস্ট বাইট’ অভিযানে নিহত ‘জঙ্গি’ সাইফুল ইসলাম চাকরির কথা বলে ঢাকায় এসেছিল বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম।

মনিরুল জানান, সাইফুল বরিশাল বিএম কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ৭ আগস্ট চাকরির কথা বলে বাড়ি থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। ঢাকায় আসার পর সংগঠন থেকে শোক দিবসে আত্মঘাতী হামলার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে।

পুলিশ কর্মকর্তা আরো বলেন, গোয়েন্দা তথ্য ছিল, শোক দিবসের মিছিলে আত্মঘাতী হামলা চালানো হবে। এ কারণে জঙ্গিরা ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরকে টার্গেট করেছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতেই ৩২ নম্বরের আশপাশের এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়। যেহেতু ৩২ নম্বর, পান্থপথ, তিন রাস্তার মোড়—তিন দিক থেকেই মিছিল আসতে পারে, তাই জঙ্গিরা এর আশপাশে অবস্থান করবে বলে পুলিশ খবর পায়। সেই খবরের ভিত্তিতেই সোর্সের মাধ্যমে সাইফুলের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

মনিরুল জানান, মঙ্গলবার রাতে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল আবাসিকের প্রত্যেকটি কক্ষ তল্লাশি করা হয়। এ সময় ৩০১ নম্বর কক্ষে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। নিহত জঙ্গি সাইফুল ট্রাভেল ব্যাগে করে তিনটি বোমা নিয়ে আসে, যার একটি বিস্ফোরণের ফলে রুমের দরজা, জানালাসহ ভবনের কিছু অংশ ভেঙে পড়ে। আর একটি বোমা বিস্ফোরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। অপর একটি বোমা অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই ‘অপারেশন অগাস্ট বাইট’ শেষ করা হয়েছে।

মনিরুল ইসলাম বলেন, সাইফুল ইসলাম নব্য জেএমবির সদস্য। কিন্তু জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জঙ্গি অবস্থান করছে সন্দেহে মঙ্গলবার ভোর থেকে পান্থপথে স্কয়ার হাসপাতালের পাশে অবস্থিত হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল ঘিরে রাখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হোটেলটি ঘিরে সকাল থেকে অভিযান শুরু করে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াট।

print

LEAVE A REPLY