এটি একটি ‘ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায়’

প্রধান বিচারপতির সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ:
ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান: আমাদের দেশের আদালতে এর আগে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রায় হয়েছে, কিন্তু ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের মতো আর কোনো রায় ইতোপূর্বে এতো উত্তাপ ছড়িয়েছে বলে আমার জানা নেই। তবে এই রায়কে দলবাজ লোকেরা যেভাবেই বিবেচনা করুন না কেন, সার্বিক বিবেচনায় দেশের বিচারবিভাগের ইতিহাসে এটি একটি ‘ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায়’। এর মাধ্যমে দেশ ও জাতির স্বার্থে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যে ধরনের সাহস দেখিয়েছেন তাতে সত্যিই ভূয়সী প্রশংসার যোগ্য।
বিচারবিভাগের ইতিহাস ঘেটে যা জানা যায় তাতে, এ ধরনের একটি সাহসী রায় দিয়ে এসকে সিনহা সাম্প্রতিকালের শ্রেষ্ঠ বিচারকের সুনাম কুঁড়িয়েছেন। পাকিস্তান আমলের বিচারপতি মোর্শেদ যেমন যুগান্তকারী রায় দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছিলেন তেমনি সিনহা সাহেবও। যদি না তিনি কোনো আপোস করেন।
ফলে প্রধান বিচারপতির সামনে এখন দুটি পথই খোলা আছে- নির্বাহী বিভাগের চাপে নতি স্বীকার করে আপোস করা কিংবা নতি স্বীকার না করে দেশের বিচারবিভাগকে অনন্য মর্যাদায় মর্যাদাশীল করা।
প্রবীণ নাগরিকদের স্মরণে থাকার কথা, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ভাগ্নে বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদের সাহসিকতার কথা। তার কিছু ব্যতিক্রমধর্মী রায়- দ্য মিনিস্টার কেইস, দ্য প্যান কেইস, দ্য বেসিক ডেমোক্রেসি কেইস, দ্য মাহমুদ কেইস এবং দ্য কনভোকেশন কেইস প্রভৃতি যা পাকিস্তানে সাংবিধানিক ইতিহাসের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডহক বিচারপতি হিসেবে দেওয়া তার একটি রায়কে ‘লিগ্যাল ক্ল্যাসিক’ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
তার প্রবাদসম সাহসিকতা ও প্রচণ্ড সাহসী রায় তৎকালীন সরকারকে ঘাবড়িয়ে দিয়েছিল। তাই সরকার বিভিন্নভাবে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছিল।কিন্তু বিচারপতি মোর্শেদ ছিলেন প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও বিবেকবান মানুষ। যখন দেখেছেন তিনি বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে বিচার করতে পারছেন না, প্রধান বিচারপতির পদ থেকে নিজেই পদত্যাগ করে ১৯৬৭ সালের ১৬ নভেম্বর দেশের গণমানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
এরপর ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানের কৌঁসুলি স্যার টম উইলিয়ামসের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন।বিচারপতি মোর্শেদের জ্ঞান ও আইনের শাসনের প্রতি সমর্থন দেখে টম উইলিয়ামস বহুবার প্রশংসা করেছেন তার। আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ ১৯৬৯) সমগ্র পাকিস্তানের যে ৩৫ জন নেতা আমন্ত্রিত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিচারপতি মোর্শেদ । প্রধান বিচারপতি থাকাকালে নিম্ন আদালতের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও তিনি রাজনীতিবিদদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। এছাড়া উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন। ফলে নানা কারণেই ইতিহাসের পাতায় আজ তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা।
এখন আসি মূল আলোচনায়, উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে অর্পণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় আইনগত দিক বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া রায়ের পর্যবেক্ষণগুলোও আরো বেশি জনগুরুত্বপূর্ণ। আর এই রায়কে ঘিরে সরকারে অস্বস্তি ও বিরোধী শিবিরে উচ্ছ্বাস। যদিও এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়, এবং আইনের দৃষ্টিতেও তাদের প্রতিক্রিয়া অর্থহীন। তবে সমস্যা হচ্ছে রায়কে ঘিরে শাসন ও বিচার বিভাগের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের বিষয়টি।
যতদূর জানা যাচ্ছে তাতে, রায়কে নিয়ে যতটা না রাজনীতিবিদদের উদ্বেগ তার চেয়ে বেশি রায়ের পর্যবেক্ষগুলোকে ঘিরে। সরকার ও বিরোধী পক্ষে চলছে তুমুল বাকযুদ্ধ। আদালতের রায়ে যেসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে তাতে সরকারে চরম অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। আর এতে সরকার যে কঠিন চাপের মুখে পড়েছে তা মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের বক্তব্য থেকেই দৃশ্যত হচ্ছে। সরকার পক্ষ এ রায়ের সমালোচনা করলেও বিরোধী পক্ষ এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যায়িত করে।
তবে রায়ে সংক্ষুব্ধ সরকার। এমন কী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে সরকারের মন্ত্রী-এমপি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যেই প্রধান বিচারপতিকে আক্রমণ করে কথা বলছেন। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল জরুরি সভা করে এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। আওয়ামী লীগের আইনজীবী পরিষদও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সবমিলেই রায়কে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত।
এদিকে রায়ের পর সরকারের ও দলের প্রতিক্রিয়া জানাতে শনিবার রাতে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার সঙ্গে সরাসরি দেখা করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ প্রসঙ্গে কাদের বলেছেন, ‘তার (প্রধান বিচারপতি) সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, দীর্ঘক্ষণ। আলোচনা শেষ হয়নি। আরো আলোচনা হবে।’
রবিবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (১নং) দক্ষিণ হলে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস বলেছেন, ‘একটি ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক রায়ের ড্রাফট লিখে দিয়েছেন। সমাবেশে ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘আমরা জানি কারা এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। জাতির কাছে একে-একে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জানি এ রায়ের ড্রাফট কোথা থেকে এসেছে। একটি ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক এ ড্রাফট লিখে দিয়েছেন। আমরা এ কাজের নিন্দা জানাই।’
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী-এমপিদের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য। এর মধ্যে উল্লেখ করা যায়- রায়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সাবেক এমপি অপু উকিল বলেছেন, ‘আমরা জানতে পারছি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা স্বাধীনতার সময় শান্তি কমিটিতে ছিলেন। এ শান্তি কমিটির প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিলো হিন্দু নিধন। একজন হিন্দু কিভাবে শান্তি কমিটিতে যোগ দেন? ফলে তিনি হিন্দু নন। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ষড়যন্ত্র করছেন, আমরা তার অপসারণ চাই।’
মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই রায় একটা ষড়যন্ত্রের অংশ। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার এবং আইনমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানোর নির্দেশনা দেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি বঙ্গবন্ধুর প্রতি কটাক্ষ করার ‘ধৃষ্টতা’ দেখিয়েছেন। এ রায়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ব্যাপকভাবে অসাংবিধানিক ও অনৈতিক কথাবার্তার অবতারণা করেছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, এমনকি রায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়েও কটাক্ষ করতে দ্বিধা করেননি, আমরা ধিক্কার জানাই।
‘আপনি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে যা বলছেন, তা ঠিক নয়। বাংলার মানুষ জানে, আপনি শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন।’
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এ রায় আবেগ ও বিদ্বেষতাড়িত।
খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, প্রধান বিচারপতির অপসারণ দাবি করছি। নইলে আগামী মাস থেকে তার অপসারণ দাবিতে টানা আন্দোলনের ঘোষণা। মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সঙ্গে আঁতাত করে বেশি দিন এই মসনদে থাকতে পারবেন না।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছেন, আদালত যতবার ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করবে, আমরা ততবার সংসদে বিল পাস করব। তা আমরা অনবরত করতে থাকব। দেখি জুডিশিয়ারি কত দূর যায়।জুডিসিয়াল কন্ডিশন আনটলারেবল। সংসদের উপর তারা পোদ্দারি করবে। এদেরকে আমরা চাকরি দেই।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন ‘যারা বর্তমানে বিচারকের আসনে বসেছেন, তারা ইম-ম্যাচিউরড।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, ‘আদালতের হাত এত বড় লম্বা হয়নি যে সংসদ ছুঁতে পারে। সংসদ নিয়ে ধৃষ্টতা দেখানোর অধিকার কারও নেই।’
আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হক বলেছেন,‘ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে দেওয়া ওই রায় ছিল পূর্বধারণাপ্রসূত ও আগে থেকে চিন্তাভাবনার ফসল। সুপ্রিম কোর্টের এ ধরনের মন্তব্য মেনে নেওয়া যায় না।’‘প্রধান বিচারপতিকে প্রধান শিক্ষক আর অন্য বিচারপতিদের ছাত্র।’
অবশ্য সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চাইতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে রায় নিয়ে তুমুল বিতর্কের মধ্যে হঠাৎ প্রধান বিচারপতির বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের দুই ঘন্টার বৈঠক করেছেন। আরো বৈঠকের ইঙ্গিত দিয়েছেন কাদের নিজেই। ফলে এ নিয়ে সবমহলে চলছে নানা শোরগোল। তাহলে কী ঘটতে যাচ্ছে? এমন প্রশ্ন অনেকের।
জানা যাচ্ছে, প্রধান বিচারপতির বাসায় অনুষ্ঠিত প্রায় দুই ঘণ্টার এই বৈঠকে ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ করে আপিল বিভাগের রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে সরকার ও আওয়ামী লীগের অবস্থান তুলে ধরেন ওবায়দুল কাদের। ওই সাক্ষাতে ওবায়দুল কাদের প্রধান বিচারপতিকে জানিয়েছেন, ‘এ রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহলে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে- যা অনভিপ্রেত। রায়কে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পরিস্থিতি তৈরি হোক বা বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের মুখোমুখি অবস্থান সরকার চায় না।
তাই রায়ে থাকা অপ্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ বাদ দিয়ে রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা বিচার বিভাগের দায়িত্ব।’ প্রধান বিচারপতিকে এ দায়িত্ব নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিরসন করতে অনুরোধ জানান ওবায়দুল কাদের। তবে প্রধান বিচারপতি তাত্ক্ষণিকভাবে তার কোনো অবস্থান ওবায়দুল কাদেরকে জানাননি। জানা গেছে, পরে গণভবনে গিয়ে সাক্ষাতের অগ্রগতির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করেছেন ওবায়দুল কাদের। পরে তিনি রাষ্ট্রপতিকে দলের অবস্থান জানান।
অন্যদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও এমনটি ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ‘জাজমেন্টের মধ্যে অপ্রাসঙ্গিকভাবে যদি আসল ইতিহাস যা নয় তা বলা হয় তাহলে এ বিকৃতি ধরিয়ে দেয়ার অধিকার আমার আছে। আমাদের স্বাধীনতা রাতারাতি আসেনি। রাজনৈতিক আন্দোলনের পর জনগণের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেক্ষেত্রে এই ইতিহাস যদি আমিও বিকৃত করি তাহলে আমিও অপরাধী।’
তিনি আরো বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে আপত্তিকর, অপ্রীতিকর ও অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যের মাধ্যমে ইতিহাস বিকৃত হয়েছে। সেখানে থাকা এক্সপাঞ্জ করার মতো বক্তব্যগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত গ্রাউন্ড তৈরি করে এক্সপাঞ্জ করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিধান অনুযায়ী রিভিউ করা হবে।
অর্থাৎ সরকার চাচ্ছে যে কোনো উপায়ে এই রায়ের সংশোধন। রায়ে যেসব পর্যবেক্ষণ সরকারকে বিব্রত করছে তা বাদ দিতে। আর এমন গ্যারান্টি পেলেই সরকার রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করবে সরকারপক্ষ।
এরইমধ্যে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণার আপিলের রায়ের সার্টিফাইড কপি চেয়ে বুধবার আপিল বিভাগে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। অবশ্য সরকারের তৎপরতায় রায় পাল্টে দেয়ার আশঙ্কা বিরোধী শিবিরেরও। সরকার প্রধান বিচারপতির ওপর চাপ প্রয়োগ করে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় পরিবর্তনের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এছাড়া গত দুদিন থেকে পরিস্থিতি কিছুটা নমনীয় বলেই অনুমেয়। মঙ্গলবার কিছুটা সূর পাল্টে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির পদ সাংবিধানিক, এ পদগুলো সম্পর্কে সকলকে আরো সচেতন ও যত্নশীল হতে হবে। এছাড়া বুধবার রাতে যখন এ লেখাটি শেষ ঠিক সে মুহূর্তে গণমাধ্যমে খবর আসে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের চার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বৈঠক করছেন। ফলে ভেতরে ভেতরে যে একটা কিছু ঘটছে এমন সন্দেহ জনমনে জোরালো হয়েছে।
তবে সরকার যে তৎপরতাই চালাক না কেন এভাবে এইসকল প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তা সরাসরি বিচার বিভাগকে কঠিন এক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন বলে মনে করছেন আইনবিশেষজ্ঞরা। এখন দেখার বিষয় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা কতটা সাহসী ভূমিকা রাখতে পারেন।
বিশিষ্ট আইনজীবী ড. তুহিন মালিকের মতে, এইসব হুমকি-ধমকী দিয়ে তারা সংবিধানে বর্ণিত বিচার বিভাগের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয়কে পরাহত করেছেন। যা সংবিধানের ৭ক(২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ। যা মৃত্যুদণ্ডের সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ। সাংবিধানিক শপথকারী এইসকল ব্যক্তিবর্গ সংবিধান সংরক্ষণ ও সুরক্ষার শপথ ভঙ্গ করেছেন।
তিনি বলেন, সাংবিধানিক পদধারীর স্বপঠিত শপথের পরিপন্থী অথবা শপথের সাথে সাংঘর্ষিক যেকোনো কাজ আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অসদাচরণ। সংবিধান একজন সাংবিধানিক পদধারীর গুরুতর অসদাচরণকে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। এরূপ গুরুতর অসদাচরণ সংবিধান লঙ্ঘনের সমার্থক। তারা প্রকাশ্যে বিচার বিভাগের পবিত্রতাকে হেয় প্রতিপন্ন করেই চলেছেন। এটা গুরুতর ফৌজদারি অবমাননা ও সংবিধানের লঙ্ঘন।
এই আইনজীবী আরো বলেন, এরফলে এইসকল মন্ত্রীদের শপথ ভঙ্গ করার পর সাংবিধানিক পদে এক মুহূর্ত থাকার আর কোন নৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার নাই। সারা জাতির সামনে প্রতিশ্রুতি দিয়ে শপথ নিয়ে আইন ও সংবিধানের প্রকাশ্য লংঘন সাংবিধানিক পদে বহাল তবীয়তে থাকার অধিকারের বিলুপ্তি ঘটায়। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত আইন হিসেবে গণ্য এবং তা সকলের ক্ষেত্রেই মানা বাধ্যতামূলক। তাহলে, এইসকল প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ কি আইনের উর্ধ্বে।
প্রবীণ আইনবিশারদ ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেছেন, ‘এটা খুবই মন্দ নজীর হচ্ছে’।
অবশ্য প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা এক অনুষ্ঠানে বলেছেন,সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় অনেক চিন্তাভাবনা করেই দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে কারো ফাঁদে পা দেব না। তবে কেউ যদি গঠনমূলকের বাইরে গিয়ে সমালোচনা করে তাহলে বিচার বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে বিচারবিভাগ সরকার বা বিরোধী দল কারো ট্র্যাবে পড়বে না।
এখন দেখার বিষয় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা আগামী দিনে বিচারবিভাগের মান-মর্যাদা রক্ষায় কতটা সাহসী ভূমিকা রাখতে পারেন। তা দেখতে অবশ্য আমাদেরকে আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

rtnn

print

LEAVE A REPLY