ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে রোহিঙ্গা নারীরা

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান: ইতোপূর্বে পৃথিবীতে যত যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে তাতে নারী-শিশুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং নিগৃহীত হয়েছে। এবারো সেটার ব্যত্যয় ঘটেনি। মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যা ঘটছে তা রীতিমত আতকে উঠার মত। বিশেষ করে নারী-শিশুদের ওপর যে ধরনের নির্যাতন চলছে তা আইয়্যামে জাহেলিয়াতসহ সব যুগের বর্বরতাকে হার মানিয়েছে।
জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিক সংগঠনের ভাষ্য এবং গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অবস্থান করছে। চার লাখই এসেছে গত তিন সপ্তাহে। এর অর্ধেকেরই বেশি নারী। এর মধ্যে বেশির ভাগ তরুণী ও অবিবাহিত মেয়ে। এছাড়া ১৩০০ শিশুকে চিহ্নিত করা হয়েছে যাদের মা-বাবা সঙ্গে নেই। ফলে পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়।
রাখাইন থেকে কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে আসা মদিনা খাতুনের ভাষায়- ‘ওরা মেয়েদের ছাড়ে না, বিশেষ করে উঠতি বয়সের মেয়ে। ঘরের বউ যার আছে, সে শেষ। মেয়েদের তো ধর্ষণ করেই। এর পরেও ক্ষমা নেই। ওখানে মেয়েদের জীবন নেই।’
‘মেয়েদের ওপর ওদের (সেনাবাহিনীর) চোখ পড়ে বেশি। মেয়েদের ইচ্ছামতো ধর্ষণ করে। বড় বীভৎস সে দৃশ্য। সবার সামনে মেয়েদের ইজ্জত-সম্মান নিয়ে খেলা করে।’
‘নারীদের ধর্ষণ করার পর গলা কেটে হত্যা করে সেনা ও তাদের লোকজন। শুধু তাই নয়, নারীদের স্তন কেটে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর পর দেখে ওই নারী কী করে। তীব্র মৃত্যুযন্ত্রণা দিয়ে আনন্দ করে এক পর্যায়ে মেরে ফেলে।’
মদিনা ভাষায়, তার এক প্রতিবেশী নারী শিশুকে বুকের দুধ পান করাচ্ছিল। সেনারা ওই নারীর দুই স্তন কেটে দেয়। পরে ওই শিশুকে ঠেলে দেয় নারীর বুকে। এসব বীভৎস দৃশ্য তাদের খুব ভালো লাগে। এমনও দৃশ্য মদিনা দেখেছেন, যেখানে নারীকে ধর্ষণ করে শরীরে কেরোসিন ঢেলে দেয়। তার পর ওর পুড়ে মারা যাওয়া দেখে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ওপারে নিগৃহীত হয়ে পালিয়ে এসে এপারেও তাদের রক্ষা নেই। এ যেন ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী- রাখাইন রাজ্যে থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা নতুন করে সংকটে পড়েছেন তাদের মেয়েদের নিয়ে। উখিয়া এবং টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে ঠাঁই নেওয়া এ সব মেয়েদের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছর। এদের অধিকাংশই অবিবাহিত। আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে তাদের দূর্বলতার সুযোগ নিতে চাচ্ছেন দালালরা। এমনকি দালালরা কক্সবাজারসহ চট্টগ্রামের দিকে নিয়ে যাওয়ারও আশ্বাস দিচ্ছেন এসব সুন্দরী মেয়েদের। এ নিয়ে তরুণীরা যেমন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তেমনি আস্থাহীনতায় পড়েছেন তাদের পরিবারও।
একটি সিন্ডিকেট টেকনাফের উখিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের সুন্দরী মেয়ে দেখলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তারা। সুন্দরী মেয়েদের টার্গেট করে নানাভাবে কু-প্ররোচনা দিচ্ছে। রোহিঙ্গা তরুণীদের বলা হচ্ছে, নিজ ভিটেতে থাকার জন্য বসত বাড়ি দেওয়া হবে। তাতে কোন প্রকার টাকাও দিতে হবেনা। এটা শুধুই মানবতার খাতিরে বলে আশ্বাস দিচ্ছে ওই সিন্ডিকেট। গার্মেন্টের চাকুরীসহ প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়ার আশ্বাসও দিচ্ছেন তারা।
উখিয়ার বালুখালীতে আশ্রয় নিয়েছেন মিয়ানমার মংডু থেকে আসা হামিদুল আজম। তার দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে জান্নাতুলের বয়স ১৮ এবং ছোট মেয়ে পারুলের বয়স ১৪। জান্নাতুল দেখতে খুবই রুপসী। হামিদুল বলেন, প্রাণের ভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি। বড় মেয়ে জান্নাতের বিয়েও ঠিক হয়েছিল, পার্শ্ববর্তী একটি ছেলের সাথে। আমরা লাম্বার বিল সিমান্ত দিয়ে ৯ সেপ্টেম্বর শনিবার বাংলাদেশে প্রবেশ করি। কিন্তু আসার পথে দুইজন লোক তাদের বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ার কথা বলে। বলেন, শহরে নিয়ে যাবে। চাকুরীর করার সুযোগ করে দেবে।
তিনি আরও বলেন, সোমবার আবার রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ে কাজ করে যাচ্ছি বলে একজন আমার বড় মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। আমি তাতে রাজি হয়নি। একই অভিযোগ করেছেন, টেকনাফে’র ধামনখালীতে আশ্রয় নেওয়া মধ্যবয়সী নুরতাজ। দুটি মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। এক ছেলের বউ এনেছেন। কিন্তু ছোট মেয়ে মনোয়ারাকে (১৬) নিয়ে পালিয়ে আসতে হলো তাকে। এখানেই এসেই যতো বিপদ। তার সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে সে পড়েছে সমস্যায়। বাবা হারা মেয়েটি কেমন জানি ভীতস্থ। চেষ্টা করেও কথা বলানো সম্ভব হয়নি।
মনোয়ারার মা নুরতাজ বলেন, কিছু লোক এসে আমি এবং আমার মেয়েকে নিরাপদে রাখবে বলে অনুরোধ করে। তাকে লোভও দেখাচ্ছে। আমি কিন্তু ভয় পেয়েছি। তিনি বলেন, বাবা আপনারাতো এখানের। আমরাতো এখানে কিছু চিনিনা। অন্তুত নিরাপত্তায় থাকতে পারি মতো কোথাও ব্যবস্থা করা যায়? নুরতাজ বেগম ঝড়ে ভিজে অনেকটা অসুস্থ। অনেক রোহিঙ্গা শরনার্থীরা জানান, লম্পটদের পাশাপাশি কিছু দালালও রয়েছে সুন্দরী মেয়েদের ভাগিয়ে নিতে। অসহায়ত্বের সুয়োগ নিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিয়ের প্রস্তাবও। যা রিতিমতো লোকদেখানো।
এমন আরেকজন লিয়াকত আলী। তার দুটি মাত্র মেয়ে। একটি ছোট অন্যটির বয়স ১৭ বছর। মেয়েটির নাম আয়েশা। লিয়াকত বলেন, মেয়েকে নিয়ে এখানে এসেও বিপদ পিছু ধরে রয়েছে। আমার খুব ভয়, না জানি মেয়েটা হাতছাড়া হয়ে যায়। তাই রাতদিন মেয়েকে নিজ হাতে ধরে রেখেছি। দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেও শান্তি পাচ্ছি না।
উখিয়া টেকনাফের তমব্রু বালুখালী, আঞ্জুমানপাড়া, রহমতের বিল, ধামনখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় কোন কারণ ছাড়া কিছু উঠতি বয়সী যুবককে মোবাইল ফোন নিয়ে ছবি এবং ভিডিও তুললেও কেউ দেখার নেই। অভিযোগে প্রকাশ ওরা ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মী হওয়ায় কেউ কোনো কিছু মুখ বলতে পারছেন না। এদের আচরণ ও গতিবিধি সন্দেহজনক হলেও প্রশাসন এ ব্যাপারে কঠোর না থাকায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সুন্দরী মেয়েদের বাবা-মা। পাশাপাশি আতঙ্কে রয়েছে সুন্দরী ওইসব তরুণীরা। ফলে এসব ঘটনা খুবই উদ্বেগের।
ইতিহাস সাক্ষ্য ইতোপূর্বে যেসব জাতির অধঃপতন হয়েছে, করুণ পরিণতি হয়েছে তারা নারী-শিশুদের ওপর বেশি অত্যাচার নির্যাতন করেছিল। অত্যাচার উৎপীড়নে ইউরোপমুখী মানুষের স্রোত এবং সৈকতে পড়ে থাকা অবোধ শিশুর একটি চিত্র সম্প্রতি সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। আর সর্ব সাম্প্রতিককালে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে রাষ্ট্রীয় বর্বরতা চলছে সেখানেও নারী ও শিশুদের আর্তি দেখলে ভয়াবহতায় চোখ বন্ধ হয়ে আসে। মায়ানমারের সামরিক জান্তা রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে বর্বর নিষ্ঠুর গণহত্যা চালাচ্ছে, তার কোনো তুলনাই হয় না। ফলে মায়ানমারেরও অধঃপতন ও ধ্বংস অনিবার্য। সেই সঙ্গে মজলুম জনপদ আরাকানের স্বাধীনতা অত্যাসন্ন।
তাই আশ্রিত ভূখন্ড বাংলার জনপদে মজলুম নারী-শিশুদের যথাযথ নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি নজরদারি বাড়ালে লম্পট দালালদের খপ্পর থেকে রক্ষা পাবে প্রাণে বেঁচে আসা এসব নারীরা। অন্যথা, হিজরতকারী এই মজলুম নারীদের ইজ্জত-সম্ভ্রমের কিছু হলে মহান আল্লাহও সহ্য করবে না। তাই আসুন, আমরা সবাই রাখাইন থেকে আসা এই মজলুমদের সার্বিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসি। হে আল্লাহ, তুমি এই মজলুম মা-বোনদের ইজ্জত-সম্ভ্রম রক্ষা কর এবং নির্যাতনকারীদের হাতে নিহতদের সর্বোচ্চ পুরস্কার দাও।

rtnn.net

print

LEAVE A REPLY