ফেসবুকে বিরূপ মন্তব্য লেখার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নৃশংসভাবে খুন

নিজ দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতাকে ইঙ্গিত করে ফেসবুকে বিরূপ মন্তব্য লেখার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নৃশংসভাবে খুন হন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস ওরফে রুবেল। গত শুক্রবারের ঘটনা এটি। সুদীপ্তের বাবার দাবি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দলের বলি হয়েছেন তার ছেলে। চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনিও এই হত্যাকা-ের জন্য সিটি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক দুই নেতাকে দুষছেন। পুলিশও ধারণা করছে, সুদীপ্ত দলীয় কোন্দলের শিকার। সেদিনই কুষ্টিয়ায় মিরপুরের ধলসা বাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুগ্রুপের সংঘর্ষে ঘটনায় নিহত হন দলটির কর্মী শহীদুল ইসলাম হক সরদার। শহীদুলও দলীয় কোন্দলের কারণে খুন হয়েছেন নিজ দলেরই নেতাকর্মীর হাতে।
শুধু সুদীপ্ত বা শহীদুলই ননÑ রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদার টাকা ভাগাভাগি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, দলীয় পদ-পদবী, এমনকি তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনাতেও নিজেদের মধ্যেই কোন্দল-খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। প্রতিপক্ষ নয়, নিজেদের গুলি, নিজেদের রামদার কোপেই ঝরছে তাদের প্রাণ, অনেক ক্ষেত্রে প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষেরও।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার (বিএমবিএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সংঘাতে সারা দেশে হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৩১২ জন। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৪২ জন, ২০১০ সালে ৭৬, ২০১১ সালে ৫৮, ২০১২ সালে ১১৭, ২০১৩ সালে ৫৭৩, ২০১৪ সালে ১৮৪, ২০১৫ সালে ১৯৮ এবং ২০১৬ সালে ৬৪ জন নিহত হন। এ সময়কালে আহত হয়েছেন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, রাজনৈতিক সংঘাতের ২৫৬টি ঘটনায় চলতি বছরের গত ৯ মাসেই নিহত হয়েছেন ৪৪ জন এবং আহত হন ৩ হাজার ৫০৬ জন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা এবং অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, যে দলই ক্ষমতায় আসে সে দলের এক শ্রেণির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। তারা অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়ার সহজ-সরল পথ হিসেবে এ ধরনের কাজে লিপ্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক সংঘাতে হতাহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীর সংখ্যাই বেশি। এ ছাড়া বিরোধী দলের নেতাকর্মী, পথচারী, সাধারণ শিক্ষার্থী এমনকি শিশু ও নারীও রয়েছে প্রাণ হারানোর দীর্ঘ তালিকায়। হতাহতের অধিকাংশ ঘটনাতেই অভিযোগ উঠছে নিজ দলের কতিপয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। হাতেগোনা কয়েকটি ঘটনার রহস্যের জট খুললেও অধিকাংশেরই সুষ্ঠু সুরাহা হচ্ছে না। বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার কারণেই ঐতিহ্যবাহী দলটির কতিপয় নেতাকর্মী দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। রাজনীতিতে সুশাসন না এলে এ ধরনের কর্মকা- চলতেই থাকবে বলে অভিমত আসকের।
তবে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের দাবি, এত বড় সংগঠনে কিছু বিশৃঙ্খলা হতে পারে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, তদন্তে তারা অভিযুক্ত হিসেবে প্রমাণিত হলে প্রত্যেককেই শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত মাদারীপুর জেলায় ২ শতাধিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সহস্রাধিক। এর মধ্যে গত ৯ মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন ২২ নেতাকর্মী। আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশত। গেল দুবছরে আওয়ামী লীগ নেতাদের আধিপত্যের লড়াই ও ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অন্তত ৫০ জন নেতাকর্মী খুন হয়েছেন সারা দেশে। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রামেই নিহত হয়েছেন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ১২ নেতাকর্মী। ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সিলেটেই খুন হয়েছেন সংগঠনটির ৭ নেতাকর্মী। আহতের সংখ্যাও কম নয়।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ আমাদের সময়কে বলেন, এ ধরনের ঘটনায় কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে দোষী বলা বোধ করি সমীচিন হবে না প্রমাণের আগে। দলের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে, যদি কোনো নেতা বা কর্মী অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়ায় প্রমাণ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হওয়ায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন দল থেকে বহিষ্কৃতও হয়েছেন। অপরাধ করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুশিয়ারি দেন ড. হাছান মাহমুদ।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন বলেন, অপরাধীদের কোনো দল নেই। তাদের পরিচয়, শুধুই অপরাধী। ছাত্রলীগের কারো বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগের সত্যতা পেলে সাংগঠনিকভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। ইতোমধ্যে এর নজির বহুবার রেখেছে ছাত্রলীগ। এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
জানা গেছে, ২০০৯ সালের শুরুতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ইসলামী, বেগম রোকেয়া, জগন্নাথ, পটুয়াখালী ও নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েট, হাজী দানেশ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জেলা কমিটিগুলোয় সহস্রাধিক অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয় ২ শিশুসহ আ. লীগ ও ছাত্রলীগের অসংখ্য নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থী। চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল থেকে গত ১১ আগস্ট পর্যন্ত দলীয় কোন্দলে দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন হনÑ যুবলীগ নেতা ইকবাল হোসেন ওরফে মাইকেল ফকির, ছাত্রলীগ নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ, আ. কর্মী আনিস, ছাত্রলীগ কর্মী খালেদ আহমদ লিটু, আ. কর্মী আবদুল আলীম খান, ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসিন, আ.লীগ নেতা তানজীরুল হক,
স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবদুল মান্নান, যুবলীগ নেতা সামিউল আলম লিটন, যুবলীগ নেতা সি এম বাদশা ফয়সল, আ.লীগ নেতা জাকির হোসেন হাওলাদার, আ.লীগ কর্মী মো. মাসুদ, শাহাবুদ্দিন শাহিন, ফারুক, সাইদুর ও হোসেন খাঁ।
এ ছাড়া আ.লীগের শাসনামলে খুন হন ছাত্রলীগ নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে রাজীব, নাছিম আহমেদ সোহেল, ছাত্রমৈত্রীর নেতা রেজানুল ইসলাম চৌধুরী, এমসি কলেজের ছাত্র উদয়েন্দু সিংহ পলাশ, পাবনা টেক্সটাইল কলেজের ছাত্রলীগের কর্মী মোস্তফা কামাল শান্ত, কাজি হাবিবুর রহমান, ছাত্র আবু বকর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিউদ্দিন, হারুন অর রশিদ কায়সার, আসাদুজ্জামান, ছাত্রলীগ কর্মী সোহেল, নাসিরুল্লাহ নাসিম, আবিদুর রহমান, খালেদ আহমদ লিটু তেজগাঁও পলিটেকনিকে রাইসুল ইসলাম রাসেল, জাবির ছাত্রলীগের কর্মী জুবায়ের আহমেদ, ছাত্রলীগের কর্মী মোস্তফা কামাল, ছাত্রলীগের আল আমীন, দিয়াজ ইফরান চৌধুরী, জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম, আবদুল্লাহ কচি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল আজিজ খান সজীব,
চাঁদপুরে বিল্লাল, ছাত্রলীগের নেতা আবদুল্লাহ আল হাসান, আবদুল আলী, ছাত্রলীগের চিলমারী উপজেলা সাংস্কৃতিক সম্পাদক বাহাদুর রহমান, হাবিপ্রবিতে ছাত্রলীগের কর্মী ফাহিম মাহফুজ, ছাত্রলীগ নেতা আবদুল মালেক জনি, রিপন হোসেন দাদা, রুহিজ, হেভেন চৌধুরী, সায়াদ ইবনে মোমতাজ, ছাত্রলীগকর্মী আসাদুজ্জামান, সুমন চন্দ্র দাস, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাইমুল ইসলাম রিয়াদ। সহিংসতার নেপথ্য কারণ চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আধিপত্য বিস্তার, দলীয় কোন্দল নতুবা ভর্তি-বাণিজ্য, খাবার টোকেন বা নারীবিষয়ক এমনকি তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণ। এ ছাড়া ১৮ দলের অবরোধ কর্মসূচির দিনে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে দর্জি বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে নতুন ইতিহাসের জন্ম দেয় ছাত্রলীগ।

print

LEAVE A REPLY