বহুল আলোচিত সাঈদীর রায়ের অপেক্ষা

Saydeeঢাকা: মানবতাবিরোধী অপরাধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদীর আপিলের রায় আজ বুধবার ঘোষণা করবেন ‍আপিল বিভাগ। বুধবার রায় ঘোষণার জন্য আপিলের কার্য তালিকার তিন নম্বরে উঠে আসে মামলাটি। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ মামলাটির রায় ঘোষণা করবেন। আপিল বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী সকাল সোয়া নয়টায় এ রায় ঘোষণা হতে পারে। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন- বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদীর আপিলের শুনানি শেষে গত ১৬ এপ্রিল রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখেন আপিল বিভাগ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুর এবং বরিশালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ২০টি অভিযোগ আনা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে ইব্রাহিম কুট্টি এবং বিসাবালী নামের দুজনকে হত্যার ঘটনায় সাঈদীর ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১।

ট্রাইব্যুনালের এ রায়ের বিরুদ্ধে উভয়পক্ষের আপিল শুনানি শেষ করতে দীর্ঘ আট মাসে ৪৯ কার্য দিবস সময় নেন। এরপর মামলাটি রায়ের জন্য পাঁচ মাস অপেক্ষমান রাখে আদালত।

এর আগে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার আপিল নিষ্পত্তি করে রায় কার্যকর করা হয়েছে। আর আব্দুল আলীম মৃত্যুবরণ করায় তার আপিল কার্য তালিকা বাদ দিয়েছেন আদালত।

গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ট্রাইব্যুনাল ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেন। এর এক মাস পর ২৮ মার্চ আপিল করে উভয়পক্ষ।

গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে এ মামলার আপিল শুনানি শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন- এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এমকে রহমান। তাদের সহযোগিতা করেন প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী।

আসামিপক্ষে শুনানি করেন- খন্দকার মাহবুব হোসেন, এডভোকেট এসএম শাহজাহান। তাদের সহযোগিতা করেন ব্যারিস্টার তানভীর আহমেদ আল আমীন।

সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত ২০টি অভিযোগের মধ্যে সন্দেহাতীতভাবে ৮টি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। এর মধ্যে দুটি অভিযোগে অর্থাৎ ৮ ও ১০ নং অপরাধে সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এছাড়া ৬, ৭, ১১, ১৪, ১৬ ও ১৯ নং অভিযোগ প্রমাণিত হলেও এগুলোতে কোনো সাজার কথা ঘোষণা করেননি ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনাল জানান, দুই অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় বাকিগুলোতে আর সাজা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আর বাকি ১২টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় সেগুলোতেও কোনো সাজা ঘোষণা করা হয়নি।

ট্রাইব্যুনাল এই দুই হত্যার দায়ে সাঈদীকে ফাঁসির আদেশ দেন। হত্যাকাণ্ডের এ দুই অভিযোগ আনা হয়েছে সাঈদীর বিরুদ্ধে ৮ ও ১০নং অভিযোগে।

সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ৮ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ৮ মে বেলা তিনটায় সাঈদীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় সদর থানার চিতলিয়া গ্রামের মানিক পসারির বাড়িতে হানা দিয়ে তার ভাই মফিজ উদ্দিন এবং ইব্রাহিমসহ দুই ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যান।

সেখানে পাঁচটি বাড়িতে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সেনা ক্যাম্পে ফেরার পথে সাঈদীর প্ররোচণায় ইব্রাহিমকে হত্যা করে লাশ ব্রিজের কাছে ফেলে দেয়া হয়। মফিজকে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।

অভিযোগ-১০ এ বলা হয়েছে, ২ জুন সকাল ১০টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে তার সশস্ত্র সহযোগীরা ইন্দুরকানি থানার উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার হানা দিয়ে ২৫টি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এসব বাড়ির মালিকেরা হলেন- চিত্তরঞ্জন তালুকদার, হরেণ ঠাকুর, অনিল মণ্ডল, বিসা বালি, সুকাবালি, সতিশ বালা প্রমুখ। সাঈদীর ইন্ধনে তার সহযোগীরা বিসা বালিকে নারকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে।

প্রমাণিত অন্য ৬ অভিযোগ

ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ৬, ৭, ১১, ১৪, ১৬ ও ১৯ নং অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন রাষ্ট্রপক্ষ। তবে ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে জানান, ২ অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় এসব অপরাধে নতুন সাজা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

২০১১ সালের ৩ অক্টোবর প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সাঈদীর বিচার শুরু হয় ট্রাইব্যুনালে। প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর। সাঈদীর বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৮ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। আসামিপক্ষে সাক্ষ্য দেন ১৭ জন।

এরও আগে ২০১১ সালের ১১ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। ১৪ জুলাই সাঈদীর বিরুদ্ধে সে অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা এক মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেপ্তার হন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। ওই বছরের ২ আগস্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক দেখানো হয় তাকে। ২০১০ সালের ২১ জুলাই থেকে ২০১১ সালের ৩০ মে পর্যন্ত সম্পন্ন হয় তদন্ত কার্যক্রম।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে উভয়পক্ষে যুক্তিতর্ক শেষ হয় ২০১২ সালের ডিসেম্বরে। ওই বছরের ৬ ডিসেম্বর থেকে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক। তবে স্কাইপে কথোপকথনের জের ধরে বিচারপতি নিজামুল হকের পদত্যাগের পর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে ফের শুরু হয় যুক্তিতর্ক। সব প্রক্রিয়া শেষে ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয় মামলাটি।

এদিকে, আপিল বিভাগে এখন শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে- জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম, বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলা। এর মধ্যে আপিল শুনানির শেষ পর্যায়ে রয়েছে- সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মামলা।

এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ চারটি মামলা ট্রাইব্যুনালে রায়ের অপেক্ষমান আছে।

print

LEAVE A REPLY