রিভিউর আবেদনের খসড়া চূড়ান্ত

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রদত্ত রায় নিয়ে রিভিউর আবেদনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। গত শনিবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের উপস্থিতিতে রিভিউ কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়। খসড়ায় রাষ্ট্রপক্ষে ৪৭টি সুনির্দিষ্ট যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। এসব যুক্তির ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ও বাতিল চাওয়া হয়েছে বলে সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ ও একাত্তরের ১০ এপ্রিল প্রণীত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ উল্লেখ করে রিভিউ আবেদনে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক নেতৃত্বেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি। আপিল বিভাগের রায়ে এ বিষয়ে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে, তা সংশোধন করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ ও সংসদে এমপিদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট না দেওয়ার ক্ষমতা-সংক্রান্ত ৭০ অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে রিভিউ আবেদনে বলা হয়েছে, এ দুটি বিষয় আপিল বিভাগের রায়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। রিভিউয়ে এসব যুক্তি তুলে ধরে তা ‘এক্সপাঞ্জ’ করার জন্য আইনগত ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ উপস্থাপন হবে।

সুপ্রিম কোর্ট রুলস অনুসারে রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি সংগ্রহ করার ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন দাখিল করার বিধান রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষ নির্ধারিত সময়ের পরও রিভিউ আবেদন দাখিল করার সুযোগ রয়েছে। তবে বিলম্বের জন্য আপিল বিভাগে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। অ্যাটর্নি

জেনারেল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ আগামী সপ্তাহের মধ্যে আপিল বিভাগের সংশ্নিষ্ট শাখায় রিভিউ আবেদন করা হবে। এ জন্য তাদের প্রস্তুতি চলছে।
অবশ্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, ‘এ মাসের মধ্যে রিভিউ আবেদন করা হবে।’ এ বিষয়ে রিভিউ কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছি। শিগগিরই রিভিউ করা হবে।’

এদিকে রিভিউ কমিটির এক সদস্য জানান, গত শনিবার আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের দিকনির্দেশনা অনুসারে রিভিউ আবেদনের খসড়া প্রস্তুত হয়েছে। খসড়াটি নিয়ে ফের আইনমন্ত্রীর পরামর্শ নেওয়ার কথা রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলেই আবেদনটি আপিল বিভাগে দাখিল করা হবে।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল চেয়ে রিটকারী ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনে হাইকোর্টে তিন সদস্যের বেঞ্চের দেওয়া বিভক্ত রায় এবং আপিল বিভাগের দেওয়া রায় মিলিয়ে যে দুটি রায় পাওয়া যায়, তার আইনগত অবস্থা নিয়ে আপিল বিভাগে রিভিউ আবেদনের শুনানি হবে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজ্ঞরা বলছেন, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায়ে সংসদ, গণতন্ত্র এবং সংবিধানের ৭০ ও ১১৬ অনুচ্ছেদসহ এমন কিছু বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে, যা এ মামলার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। রিভিউতে এসব যুক্তি তুলে ধরে তা ‘এক্সপাঞ্জ’ করার জন্য আইনগত ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি রায় কেন যথাযথ নয়, তার আইনগত দিক নিয়ে উপস্থাপন করা হবে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি।

অন্যদিকে রিটকারীর পক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘রিভিউ আবেদনের ওপর দীর্ঘ শুনানি হতে পারে। কারণ, এর আগে সরকারপক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। কিন্তু এখন তারা পুরো রায়ই বাতিল চান। কিসের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষ রায়টি বাতিল চাইছে, সেটি আইনি ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের ভিত্তিতে আদালতে চূড়ান্ত হবে।’

এ প্রসঙ্গে মনজিল মোরসেদ আরও বলেন, সাধারণত রায়ে আইনগত বা কাঠামোগত কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে আদালত সেগুলো সংশোধন করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে রায় পরিবর্তন হওয়ার নজির খুবই কম। তবে এবার যেহেতু ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় রিভিউর জন্য রাষ্ট্রপক্ষে ১১ সদস্যের কমিটি কাজ করছে, সে ক্ষেত্রে আপিল বিভাগে এ নিয়ে দীর্ঘ শুনানি হতে পারে।

রাষ্ট্রপক্ষের ৪৭ যুক্তি :সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল বাতিলের যুক্তি হিসেবে রিভিউ আবেদনে বলা হয়েছে, বাহাত্তরে মূল সংবিধানে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল ছিল না। তখন উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত ছিল। তবে দুই বছর পর সংবিধান সংশোধন করে ওই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়। ২০১৪ সালে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারক অপসারণের সেই ক্ষমতা আবারও সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংসদ শুধু দোষী সাব্যস্ত বিচারককে অপসারণের বিষয়টি অনুমোদন করবে।

রিভিউ আবেদনে আরও বলা হয়, কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে পুরো বিষয়টি পৃথক তদন্ত করা হবে। এসব তদন্ত বিচারপতিদের নেতৃত্বে একটি কমিটি করবে, যেখানে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিবর্গ থাকবেন। এসব তদন্ত প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত বিচারককে আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ দেওয়া হবে। সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল বাতিলের বিষয়ে রিভিউ আবেদনে বলা হয়, এটি সামরিক সরকার প্রবর্তিত ব্যবস্থা। বাহাত্তরের মূল সংবিধানেরও পরিপন্থী।

ষোড়শ সংশোধনী রায় বাতিলের বিষয়ে বলা হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে সংবিধানের ২২, ৯৪(৪), ১৪৭(২) ও ৯৬ অনুচ্ছেদ পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। কারণ ১৪৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের আইনের দ্বারা বা অধীন যা নির্ধারিত হবে না, তা রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা যেরৃপ নির্ধারণ করবেন তা প্রযোজ্য হবে। আপিল বিভাগের রায়ে বিচারকদের আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের বিষয়ে রিভিউ আবেদনে বলা হয়েছে, এটি কোনোভাবেই এ মামলায় বিবেচ্য বিষয় নয়। সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠন হওয়ার পর ওই কমিটি এটি করতে পারে, কিন্তু তা না করে কমিটি গঠন হওয়ার আগেই রায়ে আচরণ বিধিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি পুনর্বিবেচনা হওয়া প্রয়োজন।

বিচারকদের নিয়োগবিধি-সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ ও সংসদে এমপিদের ক্ষমতা-সংক্রান্ত ৭০ অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে রিভিউ আবেদনে বলা হয়েছে, এ দুটি বিষয় অসঙ্গতিপূর্ণ। কারণ এ দুটি বিষয় এ মামলায় আদালতের বিবেচ্য বিষয় নয়। তা ছাড়া এ দুটি বিষয় নিয়ে উচ্চ আদালতে পৃথক রিট বিচারাধীন।

সংসদকে অপরিপকস্ফ উল্লেখ করে রায়ের পর্যবেক্ষণে আপিল বিভাগের সমালোচনা প্রসঙ্গে রিভিউ আবেদনে বলা হয়, জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে সংসদ। এই সংসদকে অপরিপকস্ফ বলা মোটেই শোভনীয় নয়। তা ছাড়া এটি আদালতের রায়ের বিবেচ্য বিষয় ছিল না। রিভিউ আবেদেন এ প্রসঙ্গটি বাতিলের জন্য বলা হয়েছে। একইভাবে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের নিয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে, তা বাতিলের জন্য বলা হয়েছে।

প্রেক্ষাপট :সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর আসাদুজ্জামান সিদ্দিকীসহ সুপ্রিম কোর্টের ৯ আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। পরে ৯ নভেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ওই রিটে রুল জারি করেন। পরে গত বছরের ৫ মে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ, বাতিল ও সংবিধান পরিপন্থী বলে রায় ঘোষণা করেন। এর পর রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের শুনানি নিয়ে গত ৩ জুলাই ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের দেওয়া ওই রায় ১ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ওই রায় নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে ১৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে সরকার। ওই প্রস্তাব পাসের আগে সংসদে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপিসহ ১৮ জন বক্তব্য রাখেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আদালত তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে সংসদে আনা সংবিধান সংশোধন বাতিলের এ রায় দিয়েছেন। ‘সংসদ ও গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে’ এ রায় দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সরকারপ্রধান। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের ওই রায় ‘ভ্রমাত্মক’ বলে প্রতিক্রিয়া জানান আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক।

এই রায় নিয়ে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের টানাপড়েনের মধ্যে ২ অক্টোবর অসুস্থতাজনিত কারণে ছুটিতে যান প্রধান বিচারপতি। পরে তিনি অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ১৩ অক্টোবর ঢাকা ছাড়েন। আগামী ১০ নভেম্বর প্রধান বিচারপতির ছুটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

সমকাল

print

LEAVE A REPLY