ভয়ঙ্কর কথিত বন্দুকযুদ্ধ আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন

বাংলাদেশে বর্তমানে সমালোাচিত ও ভয়ঙ্কর বিষয় হলো কথিত বন্দুকযুদ্ধ। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও র‌্যাব-পুলিশ ও ডিবি পুলিশের সঙ্গে কথিত এই বন্দুকযুদ্ধে একজন দুইজন করে মানুষ মারা যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই কথিত এই বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ করতে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছে। কিন্তু, সরকার কারও কথাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। বর্তমানে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কথিত এই বন্দুকযুদ্ধ আতঙ্কে ভুগছে।

পুলিশ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে কিছু দিন পর পর ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে যে বন্দুকযুদ্ধে কোনো ভাল মানুষ মরছে না। শুধু চিহ্নিত সন্ত্রাসীরাই বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছে। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আত্মরক্ষার্তেই গুলি চালায়। তারা অন্যায়ভাবে কাউকে গুলি করে হত্যা করছে না।

কিন্ত, পুলিশ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এসব কথা বললেও বাস্তবে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কথিত এই বন্দুকযুদ্ধে যারা নিহত হয়েছে প্রত্যেকের পরিবারের পক্ষ থেকেই পরে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তাদেরকে অনেক আগেই জোরপূর্বক বাসা-বাড়ি থেকে তুলে আনা হয়েছে। পরে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে বলা হয় যে অস্ত্র উদ্ধারে অভিযানের সময় তার সঙ্গীরা র‌্যাব-পুলিশের ওপর হামলা চালালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালায়।

সর্বশেষ রাজধানীর বাড্ডার আফতাবনগরে বৃহস্পতিবার রাতে ডিবি পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে সাদ্দাম হোসেন ও আল আমিন নামে ২ যুবক নিহত হয়েছে। প্রথমে পুলিশ কথিত বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহতের কথা স্বীকার করেনি। পরে বাড্ডা থানার আব্দুল কাদের নামে একজন এসআই কয়েকটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, দুই যুবক ডাকাত দলের সদস্য। রাতে ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে।

তবে, পুলিশ এমন দাবি করলেও নিহতদের পরিবার বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। নিহত সাদ্দাম হোসেনের (২৫) পিতা হাসমত হোসেন গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করেছেন, সাদ্দাম স্ত্রী লিজা ও ৪ বছরের মেয়ে সোহানাকে নিয়ে গাজিপুর জয়দেবপুর উপজেলার মালেকের বাড়িতে থাকতো। সেখানে একটি মোম ও মশার কয়েল কারখানা চালাতো সাদ্দাম। গত ২৪ নভেম্বর সাদ্দাম স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকায় তার স্ত্রীর বড়বোনের বাসায় বেড়াতে যায়। ওইদিনই সন্ধ্যায় ডিবি পরিচয়ে ৪টি গাড়ি নিয়ে ওই বাসা থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর থেকেই নিখোঁজ ছিলো সে। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। আজ এলাকার লোক মারফত ক্রসফায়ারের খবর শুনে মর্গে এসে আমার ছেলের লাশ দেখতে পাই। তিনি বলেন, সাদ্দামের নামে কোন মামলা নাই, ডিবি পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে ক্রসফায়ার দিয়ে মেরে ফেলেছে। আমরা এর বিচার চাই।

এরপর নিহত আল-আমিনের (৩২) স্ত্রী খাদিজা আক্তার অভিযোগ করেছেন, তাদের ৩ মাস বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। ৬ বছর আগে তাদের বিয়ের পর প্রথমে গাজীপুরের বড় বাড়ি এলাকায় তারপর ঢাকার দক্ষিণ খানের তাঁতীবাড়ি এলাকায় বসবাস করছেন গত ১ বছর ধরে। তার স্বামী বিভিন্ন এলাকায় মেলার অনুষ্ঠানে বাচ্চাদের খেলনা বিক্রির ব্যবসা করেন। ১ ডিসেম্বর (শুক্রবার) জুমার নামাজের পর বাসায় এসে বের হয়ে স্থানীয় একটি হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে যান। ওই হোটেল থেকেই ডিবি পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর থেকে তাকে কোথায় নিয়েছিল, কেন নিয়েছিল কোনো ভাবেই জানতে পারেননি। আজ টেলিভিশনের খবরে এবং লোক মারফতে জানতে পেরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) মর্গে এসে স্বামীর লাশ সনাক্ত করি। তার বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলাও নেই।
দুই যুবকের পরিবারের দাবি অনুযায়ী তাদেরকে কয়েকদিন আগেই বাসা থেকে তুলে আনা হয়েছিল। তাদের বক্তব্য শুনার পর কথিত বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে মানুষের মনে যে সন্দেহ-সংশয় ছিল তা আরও বেড়ে গেছে।

বিশিষ্টজনসহ সচেতন মানুষ বলছেন, একজন মানুষ অপরাধ করলে তার জন্য আদালত আছে। আইননুযায়ী তার বিচার হবে। কিন্তু, এভাবে ধরে ধরে ক্রসফায়ার দিয়ে মেরে ফেলা সম্পূর্ণ আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। তাদের প্রশ্ন, বন্দুকযুদ্ধের নামে দেশে এসব কী হচ্ছে?

print

LEAVE A REPLY