ছাত্রলীগের ‘স্কুল কমিটি’: এসএসসি পরীক্ষার্থী খুন

নাহিদ আহমদ মাহী ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দিবা শাখার একজন নিয়মিত ছাত্র। নবম শ্রেণি থেকেই সে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। দলের বড় ভাইদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। বয়সের কারণে সে ছাত্রলীগের পদ-পদবিতে না থাকলেও ছিল একজন সক্রিয় কর্মী। নিজ গ্রুপের কর্মী ও একই স্কুলের নবম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী মাহীসহ অন্য সিনিয়রদের নাম ধরে ডাকত। এ বিষয়টি পছন্দ হয়নি গ্রুপের উঠতি কয়েকজন নেতার। স্কুল কর্মীদের ওই গ্রুপটি দেখভাল করত মো. আলী সাবাব। সাবাব ছিল ছাত্রলীগের জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রনির অনুসারী ও সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের নেতা। সাবাব জুনিয়র-সিনিয়র নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের এ ঘটনাটি শুনে দুই পক্ষকে ডেকে বিষয়টি মিটমাট করে দেয়। এর পর থেকে মাহী সামনে এসএসসি পরীক্ষা থাকায় দলে ও গ্রুপে বেশি সময় দিতে পারত না। অনেকের সন্দেহ, জুনিয়র-সিনিয়র দ্বন্দ্বের বলি হতে পারে ওই দুজন।

মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দা সায়রা মহসীন গতকাল সকালে হাসপাতালে লাশ দুটি দেখে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এদের এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের সঠিক বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সঠিক বিচার হলে আগামী দিনে আর এমন ঘটনা ঘটবে না। ’ তিনি তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. শাহজালাল জানান, ‘খুনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে সন্দেহে রুবেল নামের একজনকে আটক করা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকজনকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে পারলেই নেপথ্য রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হবে। আমরা ওদের আটকের জন্য অভিযান অব্যাহত রেখেছি। ’

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে জেলা শহরের মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের পশ্চিমাংশে নির্জন স্থানে মো. আলী সাবাব ও নাহিদ আহমদ মাহীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতে খুন করে দুর্বৃত্তরা।

তবে হত্যাকাণ্ডের পর ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও এখনো থানায় মামলা হয়নি। নিহত মো. আলী সাবাব ও নাহিদ আহমদ মাহীরের লাশের ময়নাতদন্ত শুক্রবার সকালে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালে সম্পন্ন হওয়ার পর পরিবারের লোকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিকেল সাড়ে ৪টায় নিহত দুজনের জানাজা মৌলভীবাজার ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে নাহিদ আহমদ মাহীকে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার দুর্লভপুরের তাদের গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। মো. আলী সাবাবের লাশ হিমঘরে রাখা হয়েছে। তার এক বোন অস্ট্রেলিয়া থেকে আসার পর দাফন করা হবে।

মো. আলী সাবাব ও নাহিদ আহমদ মাহীর লাশের ময়নাতন্তের জন্য মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিনজন চিকিৎসক দিয়ে একটি টিম গঠন করে। আরএমও ডা. পলাশ রায় জানান, এই টিমে ছিলেন ডা. সুব্রত কুমার রায়, ডা. আহমদ ফয়ছল জামান ও ডা. আবু ইমরান। ময়নাতদন্ত টিমের একজন চিকিসক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘দুজনেরই মৃত্যুর কারণ অধিক রক্তক্ষরণ।

লাশ দুটির শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের গভীর ক্ষত ছিল। এসব ক্ষত দিয়ে রক্তক্ষরণ হওয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত সাবাবের মামা রাফত চৌধুরী বলেন, ‘আমার ভাগনা ছাত্রলীগ করত। সে কোনো বড় নেতা ছিল না। তার সঙ্গে কারো কোনো বিরোধ আছে—এমন কিছু আমদের জানা নাই। কেন সে এমন নিষ্ঠুর হত্যার শিকার হলো, আমরা বুঝতে পারছি না। ’

মাহীর মামা ইমরান আলী বলেন, ‘ভাগনাটা লেখাপড়ায় বরাবরই ভালো ছিল। সামনে তার এসএসসি পরীক্ষা ছিল। সে বিকেল ৫টায় স্যারের কাছে পড়তে যাচ্ছে বলে বের হয়ে নিজ স্কুলের মাঠে লাশ হয়ে গেল। তার মা-বাবা বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা মনকে কিভাবে বোঝাবেন?’

print

LEAVE A REPLY