অধ্যক্ষ লাঞ্ছনাকারী রনির খুঁটির জোর কোথায়!

চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ জাহেদ খানকে লাঞ্ছনাকারী ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনির সমালোচনার ঝড় বইছে। বাড়তি ফি আদায় বন্ধের নামে রোববার কলেজে প্রবেশ করে অধ্যক্ষ জাহেদকে চড়-থাপ্পড় ও ঘুষি মারেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রনি।

অধ্যক্ষকে এভাবে মারধর করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ ছাত্ররা বলছেন, রনির এমন আচরণে ছাত্রলীগ কলঙ্কিত হচ্ছে। একের পর এক অপকর্ম করার পরও রনি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাদের প্রশ্ন- রনির খুঁটির জোর কোথায়?
কে এই রনি :
২০১৩ সালের অক্টোবরে ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন রনি। আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবেই তিনি এ পদ পান। যদিও এর আগে ছাত্রলীগের কোনো গুরুত্বপূর্র্ণ পদ-পদবিতে রনি ছিলেন না।
সাধারণ সম্পাদকের পদ পাওয়ার পর থেকেই তিনি একের পর এক অঘটন ঘটাচ্ছেন। তার অপকর্ম পুরো সংগঠনের কার্যক্রমকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। হাটহাজারীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের কেন্দ্র দখল ও প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে অস্ত্রসহ ধরা পড়েন রনি।

ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে সাজা দেন। অতিরিক্ত ফি আদায়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হানা দিয়ে শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের নেয়া সুইমিং পুল নির্মাণ প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থানসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে রনি অংশ নেয়। এতে নগর ছাত্রলীগের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। যদিও ভয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলছেন না।
যত অপকর্ম :
রনির বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে পেশিশক্তি প্রয়োগের অভিযোগ আছে। সংগঠনের নাম ব্যবহার করে তিনি নানান বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। বিভিন্ন কলেজের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নিজ সংগঠনের ছাত্রদের ওপর হামলা ও সংঘাত-সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ছেন তিনি।

এসব কারণে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংগঠনের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হচ্ছে। চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড তার একার ভূমিকায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। সর্বশেষ রোববার চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষকে প্রকাশ্যে তার কক্ষে মারধরের ঘটনা ‘টক অব দ্য টাউন’-এ পরিণত হয়।

সূত্র জানায়, পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে উন্নয়ন ফি’র নামে অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা আদায় করছে চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজ। এ টাকা না দিলে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র দেয়া হচ্ছে না- এমন অজুহাতে রনি যথারীতি দলবল নিয়ে রোববার দুপুরে চকবাজারে বিজ্ঞান কলেজ ক্যাম্পাসে যান।

সেখানে ছিলেন চকবাজার থানার একদল পুলিশও। কলেজ অধ্যক্ষ জাহেদ খানের শার্টের কলার চেপে ধরে তার (জাহেদ) কক্ষে নিয়ে যান রনি। এরপর গালে সজোরে থাপ্পড় মেরে তাকে চেয়ারে বসিয়ে দেন।

একপর্যায়ে তার ঘাড় চেপে ধরেন তিনি এবং ফিরে আসার সময় মারেন ঘুষি। জাহেদকে মারধরের এই ভিডিও ফুটেজ কলেজ ক্যাম্পাসে থাকা সিসিটিভিতে পাওয়া যায়। এই ভিডিও ফুটেজ যুগান্তরের সংগ্রহে আছে। মঙ্গলবার কয়েকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে অধ্যক্ষকে মারধরের এ সংবাদ সচিত্র দেখানো হয়।
অধ্যক্ষ জাহেদ খান যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রনি তার পেছনে লেগেছে। অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধের নামে রনি তার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতে চায়। অধ্যক্ষ বলেন, অন্যায় কিছু করলে আইন-আদালত আছে।

প্রশাসন আছে তারাই ব্যবস্থা নেবে। তিনি আরও বলেন, ‘রোববার তাকে মারধর করার পর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও লোক পাঠায় রনি। আমাকে হাসপাতাল থেকে বিনা চিকিৎসায় ফিরে আসতে বাধ্য করেছে। আমাকে মারধর করে উল্টো আমার বিরুদ্ধেই থানায় প্রতারণার মামলা করেছে রনি। দেখে মনে হচ্ছে আমরা মগের মুল্লুকে আছি।’

অধ্যক্ষকে মারধর প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসম্পাদক ইয়াসিন আরাফাত বাপ্পী যুগান্তরকে বলেন, ছাত্রদের যৌক্তিক দাবি আদায়ে ছাত্রলীগ আন্দোলন করলে সেটা ঠিক আছে।

কিন্তু সংগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে একজন অধ্যক্ষের গায়ে হাত তোলাটা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। কারণ এর মাধ্যমে তার সঙ্গে যেসব ছাত্রলীগ কর্মী উপস্থিত ছিলেন তাদের কাছে কী মেসেজ গেল। শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা যাবে।

শিক্ষক খারাপ না ভালো, অতিরিক্ত ফি আদায় করছে কিনা তা দেখার জন্য শিক্ষা বোর্ড আছে, জেলা প্রশাসন আছে। দেশের প্রচলিত আইন আছে। মহানগর ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক তো আইন হাতে তুলে নিতে পারেন না। এ ঘটনায় ছাত্রলীগ কলঙ্কিত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

এসব বিষয়ে জানতে রনির মোবাইল ফোনে মঙ্গলবার একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। অধ্যক্ষকে মারধরের ছবি ও সংবাদ সোমবার যুগান্তরে প্রকাশ হওয়ার পর রনি যুগান্তর ব্যুরো প্রধানকে ফোন করে চ্যালেঞ্জ করেন, ‘আমি অধ্যক্ষকে ঘুষি মেরেছি বা মারধর করেছি সেটি আপনি প্রমাণ করতে পারবেন।
যে ছবিটি প্রকাশ করা হয়েছে সেটি কী প্রমাণ করে আমি তাকে মেরেছি।’ এ বিষয়ে তার লিখিত বক্তব্য পাঠাতে বললে তিনি কোনো প্রতিবাদ পাঠাবেন না বলে জানান। তবে অধ্যক্ষকে মারধরের ভিডিও ফুটেজ হাতে আসার পর রনির দেয়া চ্যালেঞ্জের বিষয়ে জানার জন্য একাধিকবার ফোন করলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।

সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ৭ মে হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নে ভোট গ্রহণ চলাকালে কেন্দ্রের বাইরে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে অস্ত্রের মহড়া দেন রনি। এ সময় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হারুন-উর রশীদের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করেন।
তার কাছ থেকে এ সময় ৭.৬৫ এমএম পিস্তল, ১৫ রাউন্ড গুলি ও দুটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। আদালত তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন। পরে তিনি জামিনে বেরিয়ে আসেন।

২০১৫ সালে নগরীর পাঁচলাইশ থানাধীন মুরাদপুর এলাকায় অবস্থিত আজমীর অ্যালুমিনিয়াম ফ্যাক্টরি দখলেও নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রনি নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ আছে। ওই কারখানার মালিকপক্ষ রনির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে।

jugantor

print

LEAVE A REPLY