তারেক রহমানের নাগরিকত্ব নিয়ে আইনজ্ঞরা যা বললেন

‘তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন’—পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের সামনে এমন মন্তব্য করার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

বিষয়টি নিয়ে সঙ্গে কথা হয় সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে। তারেক রহমানের নাগরিকত্ব নিয়ে কেউ বলছেন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। আবার কেউ বলছেন, নাগরিকত্ব কোনোদিন হারায় না। আবার কেউ বলছেন, এটি তারেক রহমানের কূটকৌশল।

এ বিষয়ে আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘নাগরিকত্ব কখনো হারায় না। তবে নাগরিকত্ব সাময়িক স্থগিত করা যায়। জামায়াত নেতা গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিলের ঘোষণা করেছিল সরকার। কিন্তু হাইকোর্টে মামলা করে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পেয়েছেন। নাগরিকত্ব বাতিলের পর পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে দেশে এসেছিলেন গোলাম আযম। তারপর তিনি (গোলাম আযম) হাইকোর্টে মামলা করে নাগরিকত্ব ফেরত পেয়েছেন।’

অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘বিএনপি নেতা তারেক রহমানের নাগরিকত্ব নিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে। একদল আরেক দলকে পাল্টাপাল্টি কথার ফুলঝুরি ছুড়ছেন। এ দেশের অনেকেই অন্য দেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন। আবার তারা দেশে ফিরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। আইন অনুযায়ী দুই দেশের নাগরিকত্ব থাকতে কোনো সমস্যা নেই।’

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘তারেক রহমানের নাগরিকত্ব নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। তারেক রহমানের নাগরিকত্ব বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র খুঁজছেন, জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিক, বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন, কাজেই তাকে নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।’

সাবেক আইনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল মতিন খসরু বলেন, ‘তারেক রহমান নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন, কিন্তু তার দল বলছে তারেক রহমানকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এটি ঠিক না। নাগরিকত্ব নিয়ে তারেক রহমান কূটকৌশল করছেন। তারেক মনে করছেন, তার দল ক্ষমতায় আসলে তিনি দেশে ফিরে এসে ক্ষমতায় বসবেন।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাগরিকত্ব বিষয় নিয়ে আরও স্টাডি করতে হবে। শাহরিয়ার আলম নিজের ঘরের খবর রাখেন না, পরের ঘরের খবর নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কোন দেশের নাগরিক, তার স্ত্রী-সন্তান কোন দেশের নাগরিক ছিলেন? এটি কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানেন না।’

শাহরিয়ারের উদ্দেশে খোকন আরও বলেন, ‘সরকার তারেক রহমানের পাসপোর্ট রিনিউ (পাসপোর্টের মেয়াদ বৃদ্ধি) করেননি। ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী তারেক রহমান লন্ডনে আছেন, দুই দেশের নাগরিক হিসেবে থাকতে তার কোনো সমস্যা নেই। সরকার তারেককে নিয়ে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করছে।’
এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

আওয়ামীপন্থী আইনজীবী নেতা ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ড. মোমতাজ উদ্দিন আহমদ মেহেদী এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনকে ফোন করা হলে তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।
আওয়ামীপন্থী আরেক আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ড. বশির আহমেদকে ফোন করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তারেককে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য সাংঘর্ষিক কি না?

গত ১৭ এপ্রিল, মঙ্গলবার লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘তারেককে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের মুখোমুখি করা হবে।’ ওই দিন সন্ধ্যায় যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটে (ওডিআই) এক অনুষ্ঠানে ভাষণের পর প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ কথা বলেছিলেন।
প্রশ্নোত্তরে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘পলাতক আসামি তারেক রহমানকে তার অপরাধের জন্য অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। সরকার তারেককে দেশে ফিরিয়ে নিতে যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাকে আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা অবশ্যই একদিন তাকে দেশে ফিরিয়ে নেব।’
এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, ‘তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন। তারেক এ দেশের নাগরিক নন।’
তাহলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের বক্তব্য সাঙ্ঘর্ষিক কি না—এমন প্রশ্ন এখন অনেকেরই।

২২ এপ্রিল, রবিবার রাজধানীর বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে নিম্ন আদালতের জজদের এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, ‘দণ্ডিত তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে যাদের সাথে, যেভাবে আলোচনা দরকার; সেভাবেই আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য—এই দুই দেশের মধ্যে বন্দীবিনিময় চুক্তি নেই। তবে এই দুই দেশেরই মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাক্ট নামে একটি আইন রয়েছে। তাই বন্দীবিনিময় চুক্তি না থাকা সত্ত্বেও এই অ্যাক্টের মাধ্যমেও তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে।’
প্রিয়

print

LEAVE A REPLY