যে ১০ কিশোরী বিশ্ব পাল্টে দিয়েছে

পৃথিবীর মহান সৃষ্টি ও চির কল্যাণকর অগ্রযাযাত্রায় নারীর সম-ভূমিকার কথা কবিও গর্বের সহিত বলেছেন। সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনের নিমিত্তে হালে নারীর পদচারণা বেড়েছে, বাড়ছে। ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও সামাজিক-রাষ্ট্রীক প্রথা ভেঙে নারী বেরিয়ে আসছে বিশ্বমঞ্চে। পুরুষের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে রাখছে অসামান্য অবদান। আর প্রতিবারই তাদের সামনে অনুপ্রেরণা হিসেবে আসছে ইতিহাসে নারীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা।

সম্প্রতি নারীদের অর্জন চোখে পড়ার মত। তবে গত কয়েক সপ্তাহে আমরা যা দেখলাম তা সত্যিই হতাশাব্যঞ্জক, বেদনার। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার দোগলাস হাইস্কুলে শিক্ষার্থীদের ওপর এক তরুণ গুলি করে। যা আমাদের সতর্কবার্তা দেয় যে- তরুণদের ভুল পথে পরিচালনা করলে ফলটাও উল্টোই হবে।

তবে আমরা এখানে কিছু ব্যতিক্রমী কিশোরীর কথা বলবো। যারা কিনা সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়ে বাস্তবতা উপলব্দি করে কাজ করার করণে বিশ্বকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। তারা ভালো কাজের জন্য শত্রু পক্ষের গুলির মুখে পড়েছে, নানাভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম হাফিংটন পোস্ট অবলম্বনে বিশ্ব বদলে অবদান রাখা ১০ বালিকার বিস্ময়কর কিছু তথ্য ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি-এর পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

১. রুবি ব্রিজস
মাত্র ছয় বছর বয়সে ১৯৬০ সালে স্কুলে যাওয়ার জন্য স্বেতাঙ্গদের বাধার সম্মুখিন হয় কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ে রুবি ব্রিজস। তাকে কেন্দ্র করে সে সময় আমেরিকার নিউ ওরলেন্সে স্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে দাঙ্গা বেঁধে যায়। যা পুরো আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় ওই ছোট্ট কন্যাটি সাহসী ভূমিকা রেখেছিল। ওই নির্যাতনের প্রতিবাদ করে কৃষ্ণাঙ্গ নারী ও শিশুদের শিক্ষার অধিকারের জন্য আদালত পর্যন্ত গিয়েছিল। যা কি না আজও দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
রুবির বয়স এখন ৬৩ বছর তিনি একটি ট্রাভেল এজেন্সির মালিক এবং তার নামে একটি দাতব্য সংস্থা রয়েছে। সেটা তিনি দেখভাল করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চার সন্তানের মা। মানবতার এই মহানায়িকা ১৯৪৫ সালে ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন।

২. মালালা ইউসুফজাই
পাকিস্তানি মানবাধিকার আন্দোলনের মূর্তপ্রতীক হলেন মালালা ইউসুফজাই। ২০১২ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে নারী শিক্ষার প্রচারণা চালানো অপরাধে জঙ্গি গোষ্ঠি তালেবানরা তাকে গুলিকরে হত্যার চেষ্টা করে। ২০১৪ সালে ১৭ বছর বয়সে মালালাকে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়। এরপর তিনি লেখালেখিতে মনযোগী হন।

৩. আন ফ্রাংক

আনেলিস মারি ‘আন’ ফ্রাংক হচ্ছেন হলোকস্টের স্বীকার সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বিখ্যাত ইহুদি এক কিশোরী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে বহু ইহুদিদের হত্যা করেন তখনকার জার্মানির শাসক হিটলার। সেই ঘটনাকেই বলা হয় হলোকাস্ট। ওই সময় ফ্রাংকের চোখের সামনেই তার বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়। সে সময়কার তার দিনলিপি লেখে শত কোটি মানুষের হৃদয় কেঁড়েছে ফ্রাংক। তা ওই দিনপিলিটি এখন পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক পঠিত বই।
তার জন্ম জার্মানির ফ্র্যাংকফুর্ট আম মাইন শহরে, কিন্তু তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে। নাৎসি জার্মানির সেমিটিক বিদ্বেষী নীতির কারণে তিনি তার জার্মান নাগরিকত্ব হারাতে হয়। দিনলিপিতে সে নেদারল্যান্ডসের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালীন তার অভিজ্ঞতাগুলোকে লিখে রেখেছে। ১৯৪৫ সালে ১৫ বছর বয়সে আন ফ্রাংক জার্মানিতে মারা যায়।

৪. আলেকজান্দ্রা স্কট
জন্মের সময়ই নার্ভ ক্যানসার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট রাজ্যে মেয়ে কালেকজান্দ্রা। যখন তার বয়স চার বছর তখন সে শিশুদের ক্যানসার গবেষণার কাজে অর্থ যোগানের জন্য সরবতের দোকান নিয়ে বসে। যা তখন সকল মানুষের মনকে নাড়া দেয়। তার সেই কাজ আজও দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সে সময় অর্থাৎ ২০০১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে ১ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে স্কট। তার সেই চেষ্টার ফসল গবেষণা এখনো চলছে। কিন্তু আজ সে ধরাধামে নেই। সেই ২০০৪ সালে সে সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে। তার পরিবার তার রেখে যাওয়া কাজ এখনো চালাচ্ছে।

৫. বানা আলবেদ
সিরিয়ার আলেপ্পোতে নিজ চোখে দেখেছে হাজারো লাশের স্তুপ। চোখের সামনেই তার খেলার সাথী, আত্মীয়-স্বজনদের বোমা ফেলে হত্যা করা হচ্ছে। এসব দেখে বানানা আলবেদ বসে থাকেনি। ২০১৬ সালের ও হত্যাযজ্ঞগুলো তার মায়ের সহযোগিতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে সরাসরি দুনিয়ার মানুষকে দেখিয়েছে। ভুক্তভোগী অসহায়, নিরাপরাধ মানুষদের জন্য সবার সাহায্য চেয়েছে। তার পাশে অবশ্য দাঁড়িয়েছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোগান।

৬. জাজ জেনিস
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে জন্ম নেয় জাজ জেনিস। তৃতীয় লিঙ্গের শিশুদের শিক্ষাসহ তাদের সব অধিকারের জন্য সেই ছয় বছর বয়স থেকেই আন্দোলন করে আসছে। ২০০০ সালে জন্ম নেয়া এই শিশুটি মাত্র ছয় বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সংবাদিক বারবারা ওয়ালটারসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের শিশুদের অধিকার কথা বলেছে।
তারপর থেকেই সে বিশ্বব্যাপী তার আন্দোলনের পক্ষে কাজ করছে। এরপর সামাজিক যোগাযোগমধ্যমসহ বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে। এমনকি এ বিষয়ে সে কয়েকটি বইও লিখেছে। জাজ জেনিসের বয়স এখন ১৭। পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত বিভিন্ন সেমিনারে বক্তব্য ও মিডিয়াতে কাজ করে যাচ্ছে এই বালিকা।

৭. কাপরি ইভরিত
১৩ বছরের ইভরিত কানাডায় জন্মগ্রহণ করে। এতিম ও দুঃস্থ শিশুদের জন্য বিশ্বের ৮০টি দেশ ভ্রমণ করেছে। যখন তার বয়স ১০ তখন থেকেই তার এই যাত্রা শুরু করে। সফরকালে প্রতিটি দেশের মাতৃভাষায় গান গেয়ে মানুষের মন জয়করে ইভরিত। তার এই চেষ্টায় ‘এসওএস চিলড্রেন্স ভিজেল’ নামক এনজিও সহযোগিতা করে।

৮. মেরি শেলি
বিখ্যাত ইংরেজি সাহিত্যিক মেরি শেলি মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিখ্যাত বই ফ্রাঙ্কেস্টাইন লেখেন। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো জনপ্রিয় বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। ১৮১৮ সালে মেরি শেলি এই উপন্যাসটি রচনা করেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ইংরেজ কবি পার্সি বিশি শেলির স্ত্রী। স্বামী ও স্বামীর বন্ধু কবি লর্ড বায়রনের উৎসাহে তিনি এটি রচনা করেন। তাঁর অধিকাংশ লেখাই সাইন্স ফিকশনধর্মী। তাঁর লেখা পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘কিশোরী ও তরুণীদের সাইন্স ফিকশন পড়া উচিত।’

৯. আমারিয়ানা কোপেনি
তার বয়স যখন মাত্র আট, তখন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছে একটি ‘শক্তিশালী’ চিঠি লিখে । যেখানে সে যেখানে তার জন্মস্থান মিশিগান রাজ্যের পিছিয়ে পড়া শিশুদের কথা উল্লেখ করেছে। সেই চিঠি পেয়ে ওবামা দেখা করেছেন। সে মিশিগানের ফ্লিন্টের এতিম ও পিছিয়ে পড়া শিশুদের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে। এক্ষেত্রে তকে সহযোগিতা করেছে বিভিন্ন বেসরকারি এনজিও। এজন্য তাকে ‘লিটল মিস ফ্লিন্ট’ বলে ডাকা হয়।

১০. বিনদি আরউইন
বয়সে কিশোরী হলেও কাজে কিন্তু খুবই বড় বিনদি আরউইন। সে অস্ট্রেলিয়ার শিশু অভিনেত্রী, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, কণ্ঠশিল্পী এবং প্রাণী অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের কর্মী। বিনদি আরউইনের বয়স এখন ১৯। মেয়েটির বয়স যখন আট, তখন সে ‘বিনদি দ্য জঙ্গল গার্ল’ নামের একটি বই লেখে। যা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বইটি শিশুদের প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা ও অধিকার সংরক্ষণে আগ্রহ সৃষ্টির জন্য লেখা হয়। বিনদির বাবাও অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত অভিনেতা প্রায়ত স্টিভ আরউইন। তিনি ২০০৬ সালে মারা যাওয়ার পর থেকেই তার অসামপ্ত কাজ করে যাচ্ছে বিনদি। সে এখনো প্রাণীদের নিয়ে টিভি অনুষ্ঠান এবং বই লিখছে।

ব্রেকিংনিউজ

print

LEAVE A REPLY