গুলশানে তৎপরতা থেমে নেই ক্ষুণ্ণ হচ্ছে পুলিশের ভাবমূর্তি

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগে পুলিশের সোর্স ব্যবহার করা নিষেধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনারের পক্ষ থেকে লিখিত আদেশ জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘ডিজিটালের এই যুগে প্রথাগত সোর্স ব্যবহার করা হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পুলিশের নাম ভাঙিয়ে সোর্সরা নানা অপকর্মে লিপ্ত হওয়ায় পুলিশের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এ বিষয়ে গুলশান বিভাগের ডিসি ও এসি অফিসের পক্ষ থেকে থানাগুলোর এসআই, এএসআইসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে। এরপরও গুলশান বিভাগের বিভিন্ন থানা এলাকায় পুলিশ সোর্সদের অপরাধ তৎপরতা থেমে নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুলশান থানা পুলিশের সোর্স পরিচয়ে ফর্সা স্বপন ও নাদিম মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্ম করছে। গুলশান থানার এসআই রমজান আলীর নাম ভাঙিয়ে মাদকের কারবার করছে ফারুক।

ডিবি পুলিশের গুলশান জোনের সোর্স পরিচয়ে জামান মাদক ব্যবসা করছে। বানানীতে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক শহীদ ওরফে ফর্মা শহীদ। পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার ভয়ভীতি দেখিয়ে তিনি মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তিনি প্রতি সপ্তাহে চাঁদা নেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, শহীদ নিজেও ইয়াবা ও ফেনসিডিল ব্যবসায় জড়িত। ২০০৫ সালে বিস্ফোরক ও অস্ত্রসহ বনানী হিন্দুপাড়ার বস্তি থেকে শহীদকে গ্রেফতার করা হয়। জামিনে বের হওয়ার পর থেকে তিনি সোর্স হিসেবে কাজ করছেন।

বনানী গোডাউন বস্তির স্বপন অভিযোগ করেন, শহীদকে টাকা দিয়ে অনেকে ‘ওপেন’ মাদক ব্যবসা করেন। তবে মাদক ব্যবসায়ীদের ধরিয়ে দেয়ার পুলিশের চাপে শহীদ দেহ তল্লাশির নামে নিরীহ লোকদের পকেটে মাদক ঢুকিয়ে তাদের ধরিয়ে দেন।

একই বস্তির মোস্তফা কামাল বলেন, শহীদ সব সময় অবৈধ অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করেন। বিভিন্ন সময় পুলিশের হ্যান্ডকাফ ও পুলিশের স্টিকারযুক্ত মোটরসাইকেল নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়ান। তবে শহীদ ছাড়াও বনানীতে হৃদয়, ইয়াসিন ও উজ্জ্বল চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের গুলশান জোনের (গুলশান, বনানী) সহকারী কমিশনার (এসি) রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সোর্সদের প্রতি তার কোনো বিশ্বাস নেই। এসআই বা এএসআইরা সাধারণত সোর্স ব্যবহার করেন। আমি যখন এসআই ছিলাম তখন সোর্স ব্যবহার করিনি। যখন ওসি ছিলাম তখনও সোর্স ব্যবহার করতে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করেছি।

তিনি বলেন, গুলশান-বনানীতে এখন সোর্স নেই। তবে আগে যারা সোর্স হিসেবে কাজ করত তারা হয়তো এখনও সোর্স পরিচয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। গুলশান বিভাগের একাধিক থানা পুলিশ এরই মধ্যে কয়েকজন সোর্সকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনেছে।

গুলশান থানার এসআই রমজান আলী বলেন, ২০১৫ সাল থেকে গুলশান থানায় কর্মরত। এ পর্যন্ত যত মামলার তদন্ত করেছি কোনোটিতেই সোর্সের সহযোগিতা নেয়া হয়নি। ফারুক নামে কোনো সোর্সের সঙ্গে তার কোনো পরিচয় নেই। তবে সিরাজগঞ্জের একটি ছেলের সঙ্গে তার মাঝেমধ্যে কথা হতো। তিনি পেশায় গাড়িচালক। তার নাম ফারুক কিনা বলতে পারব না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাড্ডা থানার এএসআই লিটন মোস্তফা ও আরমান আলীর নাম ভাঙিয়ে সোর্স রহমান ইয়াবা ব্যবসা চালাচ্ছেন। তাছাড়া বরিশাইল্যা রফিক, জামাল ওরফে গ্রিল জামাল, ফর্মা বিল্লাল, বাবা শাহীন, রব, বাপ্পি, সুমন, বিপ্লব ওরফে মোটা বিপ্লব, ডিলা, আব্বাস, বাংলা নাছির, আলমগীর, ইয়াবা নাঈম, ফর্মা লিটন এবং সুমন পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত। তাদের বেশিরভাগই মাদক ব্যবসায় জড়িত। তাদের নামে ৫ থেকে ৭টি করে মামলা আছে। বেশিরভাগ মামলা, মাদক, মারামারি এবং ডাকাতির প্রস্তুতির। দুই মাসের মধ্যে জামাল, বিপ্লব, আব্বাস ও সুমনসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ জামিন পেয়েছেন।

সূত্রমতে, মাদক ব্যবসা করা ছাড়াও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সোর্সরা সরাসরি নিয়মিত মাসোয়ারা নেয়। মাসোয়ারা দিয়ে যারা মাদক ব্যবসা চালাচ্ছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন- মেরুল বাড্ডার খোকন, দক্ষিণ বাড্ডার শামীম, হাফিজ, ইকবাল, রহমত, লিমন, আলাউদ্দিন, সরফুউদ্দিন ও মিজান, জাগরণী সংসদ এলাকার সবুজ, পাগলা আক্তার, পেটমোটা জালাল প্রমুখ। বাড্ডার আরও কিছু মাদক ব্যবসায়ী সোর্সদের টাকা দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন- রাজু, লিপু, বাবু ওরফে কামান্ডার বাবু, সিডি রানা, রুবেল, মনির, বিল্লাল, সুমন, মামুন, রতন, বাবু ওরফে হিট বাবু, ওয়াসিম, সজিব, তুহিন ও মনি প্রমুখ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাড্ডা থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী বলেন, পুলিশের সঙ্গে থেকে অভিযানের তথ্য ফাঁস করে দেয় সোর্সরা। যেসব মাদক ব্যবসায়ী সোর্সদের চাঁদা দেয় না তারা তাদের পুলিশে ধরিয়ে দেয়। তাই মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশের চেয়ে কথিত সোর্সদের বেশি ভয় পায়। ওয়াজেদ আলী আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথাকথিত সোর্স নামধারী কিছু লোক এলাকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। তারা কখনও পুলিশের সঙ্গে সখ্যের সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সপ্তাহ, মাসিকসহ বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে ব্যবসার সুযোগ করে দেয়। আবার কখনও ধরিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে ওদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করে। কখনও কখনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে প্রলুব্ধ করে। কখনও মাদক ব্যবসায়ী ধরতে পারলে বা মাদকদ্রব্য উদ্ধার করতে পারলে সোর্স মানি হিসেবে উদ্ধারকৃত মাদকের অংশ দাবি করে। অনেক ক্ষেত্রে সোর্সরাই মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। এসব কারণে বাড্ডায় সোর্স নামধারী মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলছে।

সোর্সদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানের পরও ভাটারায় পুলিশের নাম ভাঙিয়ে বেশ কয়েকজন সোর্স মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্ম করছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাটারা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজুর রহমান মিয়া যুগান্তরকে বলেন, মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরুর আগেই আমরা সোর্সদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করি। সম্প্রতি কয়েকজন সোর্সকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল লিটন, মেহের আলী, আলমগীর, শাহাদাত। তাদের সবাইকে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী উল্লেখ করে মাহফুজুর আরও বলেন, এখনও যাদের খোঁজা হচ্ছে তাদের মধ্যে আনজু নামের একজন আছেন। অভিযান শুরুর পর আনজু এলাকা ছেড়েছেন বলে পুলিশ পরিদর্শক জানান।

print

LEAVE A REPLY