দায়সারা আইএসবিএন নম্বর, মিলছে না তথ্য

ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বুক নম্বরকে (আইএসবিএন) বাংলায় বলা হয় আন্তর্জাতিক মান পুস্তক সংখ্যা। এটি বইয়ের বারকোড চিহ্নিতকরণের অনন্য সংখ্যায়ন পদ্ধতি। এই নম্বরকে বিশ্বের সব বইকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড ধরা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও দায়সারাভাবে আইএসবিএন নম্বর দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতর থেকে লেখক ও প্রকাশকদের এ নম্বরটি দেয়া হয়। আগে এই নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রে নানা ভুলভ্রান্তি থাকলেও বর্তমানে যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি নম্বর সরবরাহ করছে সেটিও সেভাবে কাজে আসছে না।

অধিদফতর থেকে সরবরাহ করা আইএসবিএন নম্বর ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত কেনো বইয়ের তথ্য পাওয়া যায় না। অথচ এই নম্বরটি দেয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্যই হচ্ছে প্রকাশিত বইবিষয়ক সব তথ্য পাওয়া যাবে। বিশ্বের সব দেশের বইয়ের আইএসবিএন নম্বর ইন্টারনেটে সার্চ দিলে সব তথ্য মিললেও আমাদের এখানে তার ব্যতিক্রম।

ফলে দেশের বইয়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি যেমন আসছে না ঠিক তেমনিভাবে বিপণনও ত্রুটিপূর্ণ। প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা এজন্য আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতরকেই দায়ী করছেন। তবে সেখানকার কর্মকর্তারা বলছেন প্রকাশকদেরও দায় রয়েছে।

দেশের প্রায় সব লেখক প্রকাশকই এখন আইএসবিএন নম্বর সংগ্রহ করে বই প্রকাশ করেন। বইয়ের মোড়কের পেছনে আইএসবিএন সংবলিত একটি বারকোড বা অনেক সময় বইয়ের শুরুর দিকের পাতায় ১৩ ডিজিটের আইএসবিএন নম্বর থাকে। নম্বরে প্রথম অংশটি প্রিফিক্স। দ্বিতীয়টি দেশের কোড। তৃতীয়টি প্রকাশকের কোড। চতুর্থটি আইটেম নম্বর কোড আর শেষেরটি চেক ডিজিট।

তাই ইন্টারনেটে নম্বর ইনপুট দেয়া মানে লেখক ও প্রকাশকের নাম, বইয়ের স্বত্বাধিকারী, প্রকাশকাল ও কোন ভাষায় বইটি মুদ্রিত তার সব তথ্য পাওয়ার কথা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজী নজরুল থেকে শুরু করে হুমায়ূন আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক বা হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলনসহ অসংখ্য লেখকের বইয়ের আইএসবিএন নম্বর সার্চ ইঞ্জিনে ইনপুট দিয়ে কেনো তথ্য মিলছে না।

কিন্তু ড্যান ব্রাউন বা চিনুয়া আচেবের মতো লেখকদের বইয়ের আইএসবিএন নম্বর সার্চ করে ঠিকই তথ্য মিলছে। তবে এমাজনের ওয়েবসাইটে দেশের লেখকদের বইয়ের কয়েকটির আইএসবিএন নম্বর দিয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, এ কাজটি প্রকাশকরা কিছু নিজ উদ্যোগে করেছেন।

আইএসবিএন নম্বর যেসব কারণে জরুরি তার মধ্যে বইয়ের হিসাব রাখা, বিশ্বব্যাপী পরিচিতি, বই বিক্রিতে সুবিধা, অন্য দেশে বইটি বিক্রি করতে চাইলে কিংবা জাতীয় ক্যাটালগে অন্তর্ভুক্ত করা, বিবলিওগ্রাফিক তথ্য সঠিক রাখা, মেশিন-রিডেবল হওয়ার কারণে ভুলভ্রান্তি না হওয়া।

এ ব্যাপারে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতরে গিয়ে তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, লেখক ও প্রকাশক দুই ক্যাটাগরিতে আইএসবিএন নম্বর দেয়া হয়। বইবিষয়ক নানা তথ্য ও পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে খুব অল্প খরচেই আইএসবিএন নম্বর সরবরাহ করা হয়। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, আমাদের এখানে এখনও এনালগ পদ্ধতি ব্যবহার করে এই নম্বর বের করে তারপর দেয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালক জামাল উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আমরা যে আইএসবিএন সরবরাহ করছি সেটি সঠিক। কিন্তু সার্চ দিলে বইয়ের তথ্য পাওয়া যায় না এটি স্বীকার করেই বলছি প্রকাশকরা বইটি প্রকাশ করার পর বিভিন্ন সাইটে তথ্যগুলো আপলোড করলে বা আমাদের কাছে যে একটি বই প্রকাশের ৬০ দিন পর দিয়ে যাওয়ার নিয়ম তা করলে আমরাও সেটা নিয়ে কাজ করতে পারি।

এ ব্যাপারে জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির প্রাক্তন সভাপতি আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গণি যুগান্তরকে বলেন, আইএসবিএন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সেনসেটিভ বিষয়। নম্বর দেয়ার আগে বইবিষয়ক সব তথ্য যদি দেয়া হয়েই থাকে তাহলে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত সাইট ও পেইজে সেটি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। বিশ্বের অন্য দেশের আইএসবিএন নম্বর ইন্টারনেটে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেভাবে সব তথ্য আসে, আমাদেরটাও আসার কথা। কেন হচ্ছে না তা অধিদফতরই ভালো বলতে পারবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন প্রকাশক নেতা বলেন, প্রকাশকরা একুশে বইমেলা করার আগে অধিদফতরে বই জমা দিয়ে অনুমতি আনেন। অসংখ্য বই জমা পড়ে। সেগুলোর কেনো ডাটা তারা আজও করতে পারেনি। আইএসবিএন যদি কাজেই না লাগল তাহলে তা সঠিক হয়েইবা লাভ কী।

এ ব্যাপারে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার যুগান্তরকে বলেন, যারা আইএসবিএন সরবরাহ করছেন, নিবন্ধন করছেন তাদেরই দায়িত্ব বইবিষয়ক সব তথ্য ইন্টারনেটসহ সংশ্লিষ্ট জায়গায় নিশ্চিত করা। তাদের কাছে তো ডিজিটালি অনেক ডেটাবেইজই নেই। তবে তারা যদি আমাদের মন্ত্রণালয়ে আসেন বা আমাদের যদি কাজের ক্ষমতা দেয়া হয় আমরা তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

এ ব্যাপারে আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতরের মহাপরিচালক দিলীপ কুমার সাহা বলেন, আমরা আইএসবিএন প্রদানবিষয়ক কাজটি ডিজিটালি করার উদ্যোগ নিয়েছি। এ ব্যাপারে টেলিটকের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। আর অন্যান্য যেসব সমস্যা রয়েছে সে বিষয়গুলো সমাধানেও আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি।

print

LEAVE A REPLY