‘হাওয়া ভবন ও পিন্টুর বাসভবনে যাননি বাবর’

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হাওয়া ভবন ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসভবনে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের যাওয়ার বিষয়টি প্রমাণ হয়নি বলে দাবি করেছেন তার আইনজীবী এম নজরুল ইসলাম।

মঙ্গলবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের আদালতে বাবরের পক্ষে সপ্তম দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে তিনি এ দাবি করেন।

এদিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ না হওয়ায় আদালত বুধবার পরবর্তী দিন ধার্য করেন। এ নিয়ে মামলায় ১১১তম দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হলো। এর মধ্যে আসামিপক্ষ ৮৬ কার্যদিবস ও রাষ্ট্রপক্ষ ২৫ কার্যদিবস ব্যয় করেছে।

এর আগে ৪৪ আসামির পক্ষে যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। তবে সর্বোচ্চ আর দুই কার্যদিবসের মধ্যে বাবরের পক্ষে যুক্তিতর্ক শেষ করার কথা আদালতকে জানিয়েছেন বাবরের আইনজীবী।

এদিন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, এনএসআইয়ের (জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা) সাবেক দুই মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ কারাগারে থাকা ২৩ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।

এছাড়া এ মামলায় জামিনে থাকা খালেদা জিয়ার ভাগনে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক তিন আইজিপি- মো. আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী এবং মামলার তিন তদন্ত কর্মকর্তা- সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আবদুর রশীদ ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলামও আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এ মামলায় তারেক রহমানসহ ১৮ আসামি পলাতক রয়েছেন।

এদিন দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়।

শুরুতেই পিডব্লিউ (প্রসিকিউশন উইটনেস বা রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী)-২২৫ আব্দুল কাহার আকন্দের (মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা) সাক্ষ্য তুলে ধরে বাবরের আইনজীবী নজরুল ইসলাম বলেন, হাওয়া ভবন বিএনপির কেন্দ্রবিন্দু ছিল বলে তিনি তার চার্জশিটে উল্লেখ করেছেন। তবে হাওয়া ভবনে বাবরের যাওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা। তিনি আসামি

সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ও তার ভাই আসামি মাওলানা তাজউদ্দিনের সঙ্গে লুৎফুজ্জামান বাবরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল মর্মে বলেছেন।

তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার এমন কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। মাওলানা তাজউদ্দিনকে বাবার কখনো দেখেননি, তার সঙ্গে পরিচয়ও নেই। তদন্ত কর্মকর্তা মাওলানা তাজউদ্দিনের সঙ্গে বাবরের একটা বেআইনি সম্পর্ক দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এ মামলার কোনো ডকুমেন্টে বাবরের সঙ্গে তাজউদ্দিনের দেখা বা কথা হওয়ার তথ্য নেই। ষড়যন্ত্রের দুটি স্থান হলো হওয়া ভবন ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসভবনে লুৎফুজ্জামান বাবর যাননি। তার যাওয়ার বিষয়টি প্রমাণ হয়নি।

আইনজীবী নজরুল ইসলাম বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তার কাজ হলো- কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হলে সে ব্যাপারে যথেষ্ঠ সাক্ষী সংগ্রহ করা। বাবর একজন মন্ত্রী। তার সঙ্গে তার গাড়ি, ড্রাইভার, গানম্যান, পিএ, এপিএস কাউকে না কাউকে সাক্ষী করা উচিত ছিল। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা এমন কোনো সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তা আনতে পারেননি। আর আবদুস সালাম পিন্টু নিজেও একজন মন্ত্রী। তার বাসায় যদি লুৎফুজ্জামান বাবর গিয়ে ষড়যন্ত্র করে থাকেন, তাহলে তাদের গাড়ি, ড্রাইভার, গানম্যান, পিএ, এপিএস, বাসার গার্ড কাউকে না কাউকে সাক্ষী করা উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। শুধুমাত্র তদন্ত কর্মকর্তা মুফতি হান্নানের বেআইনি দ্বিতীয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর নির্ভর করে একজনকে দোষী বলতে পারেন না।

বাবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন এ মামলার তদন্ত গতি পায় জানিয়ে বাবরের আইনজীবী বলেন, বাবর আসামি মুফতি হান্নানের মামলার প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন বলে তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বাবর মন্ত্রী থাকাকালীন এ মামলার (২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা) তদন্ত গতি পায়। তিনিই মুফতি হান্নানকে গ্রেফতারের কথা বলেন। বলেছিলেন, তাকে (মুফতি হান্নানকে) গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ কর। অন্যায়কারী যেই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনার কথা বলেছিলেন বাবর।

বারবার অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করা হচ্ছে- এমন অভিযোগ করে বাবরের আইনজীবীর উদ্দেশে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ জোউর রহমান বলেন, এটা কী ধরনের যুক্তিতর্ক আমি বুঝতে পারছি না। এভাবে এক যুগ চললেও শেষ হবে না।

এরপর আদালত বাবরের আইনজীবীকে আরও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য বলেন। এরপর ফের নজরুল ইসলাম তার যুক্তিতর্ক শুরু করেন।

তিনি বলেন, বাবরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কথা মুখে বললে চলবে না। সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। বাবরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র স্পষ্ট ও স্বতন্ত্রভাবে প্রমাণ করতে হবে। তা না হলে আইও’র (তদন্ত কর্মকর্তার) এমন ঠুনকো কথায় সাজা দেয়া সমীচীন হবে না। আবদুস সালাম পিন্টুর বাসায় বাবর কোনোদিন যাননি। তিনি পিন্টুর বাড়ি চেনেনও না।

যুক্তিতর্কের এ পর্যায়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রাষ্ট্রপক্ষের অপর আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বাবরের আইনজীবীর উদ্দেশে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপনার আসামির বিরুদ্ধে যেসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে, আপনি সেগুলো যুক্তি দিয়ে ক্রস করবেন। আপনি এগুলো কী করছেন?

প্রত্যুত্তরে নজরুল ইসলাম বলেন, ক্রসগুলো অনেক লম্বা। আমি সেগুলোই দেখাচ্ছি। এরপর দুপুর ২টার দিকে বাবরের আইনজীবী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে আদালতের কাছে সময় প্রার্থনা করেন। তবে আদালত তাকে চালিয়ে যেতে বললে তিনি আরও কিছুক্ষণ যুক্তিতর্ক উপস্থান করেন।

এরপর সময় চেয়ে প্রার্থনা করে নজরুল ইসলাম আদালতকে বলেন, বাবরের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে আর একদিন (বুধবার) লাগবে। এরপর যদি আইনি বিষয়ে ওপর কোনো সিনিয়র শুনানি করেন, তবে আরও এক কার্যদিবস সময় লাগবে। এর বেশি সময় লাগবে না। আদালত বুধবারের মধ্যেই যুক্তিতর্ক শেষ করার জন্য বাবরের আইনজীবীকে তাগিদ দেন এবং এদিনের মতো আদালতের কার্যক্রম মুলতবি ঘোষণা করেন।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি এ মামলার সব আসামির সর্বোচ্চ সাজা অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে রাষ্ট্রপক্ষ। গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলা দুটির বিচারকাজ এক সঙ্গে চলছে। হত্যা মামলায় মোট আসামি ৫২ জন ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলায় আসামি ৪১ জন।

সর্বমোট ৫২ আসামির মধ্যে ৩৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৮ জন আসামি জামিনে এবং ২৩ জন কারাগারে আছেন। এ ছাড়া অন্য মামলায় তিন আসামির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। বাকি ১৮ পলাতক আসামির অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ চলছে। একইসঙ্গে পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও অব্যাহত আছে। মোট ৪৯২ জন সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

এছাড়া মামলায় গত বছরের ১২ জুন মামলায় ৩১ আসামির আত্মপক্ষ শুনানি শেষ হয়। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৮ আসামি পলাতক থাকায় তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি। পলাতক আসামিদের মধ্যে ১৪ জনের পক্ষে রাষ্ট্র আইনজীবী নিযুক্ত করেছে।

২০০৪ সালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভায় ইতিহাসের ভয়াবহ নৃশংস বর্বরোচিত ওই হামলার ঘটনা ঘটে। এতে দলের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জনের মৃত্যু হয়। হামলায় আহত হন কয়েকশ নেতাকর্মী। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

print

LEAVE A REPLY