যুক্তফ্রন্টের সংবাদ সম্মেলনে যত কাণ্ড

সংসদ নির্বাচনকে সামনে নিয়ে কয়েকটি দলের সমন্বয়ে যে জাতীয় ঐক্য গড়ার ঘোষণা আসলো তা শুরুতেই কিছুটা হোঁচট খেয়েছে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বদলে শনিবার বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঐক্য প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়ার কথা।

সে অনুযায়ী এই প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি কামাল হোসেনসহ অন্যান্য নেতারা বেলা সাড়ে তিনটার দিকে প্রেসক্লাবে চলে আসেলেও নির্ধারিত সময় বিকাল চারটায়ও সেখানে আসেননি যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না।

শেষ পর্যন্ত মান্না আসলেও বি. চৌধুরী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে আসতে পারেননি বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়। যদিও এ নিয়ে নানা কানাঘুষা চলছে সংবাদ সম্মেলনের শুরু থেকে শেষ অবধি।

বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে জাতীয় প্রেসক্লাবের দ্বিতীয় তলার কনফারেন্স কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, সামনের সারিতে বসে আছেন ড. কামাল হোসেন, ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মো. মুনসুর আহমেদ, সুব্রত চৌধুরীসহ কয়েকজন। পেছনের চেয়ারগুলোতেও অনেকে বসে আছেন। গণমাধ্যমকর্মীরাও কেউ ভেতরে আবার কেউ বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন।

কারণ তখনও স্পষ্ট করে বলা হচ্ছিল না যে, শহীদ মিনারে না এখানেই সংবাদ সম্মেলন করা হবে। আর আ স ম আব্দুর রব একজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে বাইরে কথা বলছিলেন। চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল কিছুটা উদ্বিগ্ন।

একজন সংবাদকর্মী রবের কাছে জানতে চাইলেন, ‘আমরা কি এখানে থাকব না শহীদ মিনারে যাব? বললেন, ‘যাওয়ার চেষ্টা করব, না যেতে দিলে আমরা এখানেই সংবাদ সম্মেলন করব।

এরপর কনফারেন্স কক্ষে ঢুকে সামনের সাড়িতে বসে পড়েন রব। পাশে বসা কামাল হোসেন এবং সুলতান মুনসুর জানতে চান, ‘বি. চৌধুরী সাহেব কতদূর আসছেন?’

রব বলেন, ‘এই মগবাজার আসছে। মেজর (অব.) মান্নানও সঙ্গে আছেন (বিকল্প ধারার মহাসচিব)।’

ফোনে কথা শেষ করে রবের একদম কাছে গিয়ে কথা বলেন বিকল্প ধারার সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক। বলেন, ‘বি চৌধুরী স্যার গাড়ির মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাকে নিয়ে বাসায় যাওয়া হচ্ছে।’

এ কথা পাশে বসা কামাল হোসেনকে বলার পর তিনিও কিছুই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। পাশ থেকে সুলতান মনসুর জানতে চান, ‘সিরিয়াস কিছু? বলো না কী হয়েছে?’

পরে মান্নানের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেন রব। বলেন, ‘তাহলে আপনি চলে আসেন। একজন না থাকলে তো আমরা প্রোগ্রাম শুরু করতে পারছি না।’

তখন সময় তিনটা ৫৫ মিনিট। কামাল হোসেন জানতে, ‘চান মান্না কোথায়?’

পাশ থেকে একজন বলেন, ‘সে প্রেসক্লাবের নীচে আছে, চলেন আমরা সবাই।’

পরে কামাল হোসেনকে ধরে তোলা হয়। আর সুলতান মনসুর ও রবকে নিয়ে তিনি লিফটে করে নীচ তলায় নেমে আসেন।

এরপর ড. কামাল গাড়িতে ওঠেন এবং অন্যরা সবাই প্রেস ক্লাবের মূল ফটক দিয়ে সামনের রাস্তায় চলে যান। সেখানে গিয়ে সারিবদ্ধভাবে ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে দিতে শহীদ মিনারের দিকে হাঁটা শুরু করেন ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা।

সামনে যাচ্ছিল ড. কামালের গাড়ি। কিন্তু প্রেসক্লাবের পশ্চিম পাশের গেটের সামনে আসার পরই হঠাৎ থেমে যায় মিছিল। দেখা যায় গাড়ির উপরের দিকে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে বক্তব্য দিচ্ছেন রব।

জেএসডি নেতা বলেন, ‘আমরা যেতে চেয়েছিলাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। কিন্তু প্রশাসনের নির্দেশে ঢাবি কর্তৃপক্ষ আমাদের বলেছে সেখানে কোনো কর্মসূচি করতে দেয়া হবে না। আমরা এর নিন্দা জানাই। সাংবাদিক ভাইয়েরা আপনারা প্রেস ক্লাবে চলুন। সেখানেই ঘোষণা দেয়া হবে।’

তবে রব এ কথা বললেও সেখানে উপস্থিত গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মী বলেন, ‘তারা চাইলে শহীদ মিনারে যেতে পারেন, বাধা দেয়ার কোনো খবর আমাদের কাছে নাই।’



পরে সাংবাদিকরা ছুটে যান প্রেসক্লাবের দ্বিতীয় তলায়। আর সেখানে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। তবে তার আগে রব বলেন, ‘যারা আমাদের আজকে শহীদ মিনারে যেতে দিল না তাদের উপর গজব পড়ুক।’

কনফারেন্স কক্ষে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ও সংবাদ সম্মেলন কভার করতে আসা গণমাধ্যমকর্মীদের তখন গরমে সিদ্ধ হওয়ার অবস্থা। কারণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র-এসি বেশ কিছুক্ষণ বন্ধ ছিল আর সবে সেটা চালু হয়।

এ রকম রব বলেন, ‘এসি বন্ধ কি না, আমি জানি না, যারা আছেন দেখেন।’

পরে ড. কামাল তার বক্তব্যে গরমের বিষয়টি তুলে ধরেন। বলেন, ‘এই গরমের মধ্যে যে আপনারা আসছেন, তাতে আমরা আশাবাদী।’

আয়োজকদের আসনে থাকা মান্নার তখন অস্থির হয়ে উঠেন। একজনকে বলেন, ‘আমাকে বাতাস দাও।’

তখন পোস্টারজাতীয় কাগজ দিয়ে একজন বাতাস করছিলেন। মান্না তখন হাত দিয়ে ইশারা করেন তার দিকে বাতাস করতে।



এর মধ্যেই অবশ্য জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া এবং যুক্তফ্রন্টের কর্মীরা হঠাৎ নিজেদের মধ্যে এসব কর্মীরা তর্কে জড়িয়ে পড়েন।

একজন বলে উঠেন, ‘হু আর ইউ?’ জবাব দিয়ে আরেকজন বলেন, ‘আমি যে হই তুমি কে? চিন আমাকে। লোকজন আমরা নিয়া আসছি।’

পরে পিছন থেকে একজন বলেন, ‘ভাই এখানে কি আপনার ম্যান বড়, না দল বড়? চুপ করেন।’

তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করেন মান্না। তিনি বারবার থামতে বলার পরও অবশ্য থামছিলেন না। এক পর্যায়ে রেগে গিয়ে বলেন, ‘এখানে যদি কেউ কোনো কথা বল, সে যেই হও তাকে কিন্তু বের করে দিব।’ পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

এভাবে করেই এগিয়ে যায় সংবাদ সম্মেলন। শেষের দিকে কিছুক্ষণ চলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর না দেয়ার পালা। সবশেষ বেলা পাঁচটার দিকে সংবাদ সম্মেলনের ইতি টেনে একে একে গাড়িতে করে প্রেসক্লাব চত্বর ত্যাগ করেন রাজনীতিতে নতুন ধারা সৃষ্টির লক্ষ্যে যাত্রা করা ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার’ নেতারা।

ঢাকাটাইমস

print

LEAVE A REPLY