বাম কিডনির অপারেশন, ডান কিডনি উধাও!

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চলচ্চিত্র পরিচালক রফিক শিকদারের মা রওশন আরা’র অস্ত্রোপচারের পর তার ভালো কিডনিটিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক দাবি করেছেন, রোগীর পেটেই কিডনি রয়েছে, সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরীক্ষায় ধরা পড়ছে না।

তবে, অন্য কিডনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ কিংবা অসুস্থ যেকোনো মানুষের পেটে ক্ষুদ্রতম বস্তু থাকলেও তা পরীক্ষায় ধরা পড়বে; এমনকি একটি সুঁচও। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি ও মেডিকেল বোর্ড গঠন করলেও বিষয়টি নিয়ে সঠিক তদন্ত না হলে আইনের সহায়তা নেয়ার কথা জানিয়েছেন রফিক শিকদার।

রফিক শিকদার বলেন, ‘কিডনি জটিলতাজনিত কারণে আমার মা বিএসএমএমইউ’তে ভর্তি ছিলেন। এ সময় চিকিৎসক হাবিবুর রহমান দুলাল বলেন, আপনার মায়ের বাম কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে, এটি ফেলে দিতে হবে। তখন আমরা তার কাছে জানতে চাই, বাম কিডনি ফেলে দিলে পরবর্তীতে কোনো সমস্যা হবে কিনা? কিংবা একটি কিডনি নিয়ে তিনি কতদিন বেঁচে থাকতে পারবেন? এই প্রশ্নের জবাবে হাবিবুর রহমান বলেন, একটি কিডনি ১০০ বছরের বেশি ভালো থাকে এবং একটি কিডনি নিয়েই যে কেউ শতবছর বেঁচে থাকতে পারেন। এরপর তারা ৫ সেপ্টেম্বর আমার মায়ের অস্ত্রোপচার করে কিডনি ফেলে দেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিডনি ফেলে দেয়ার পর থেকেই আমার মায়ের প্রস্রাব হচ্ছিল না। এসময় চিকিৎসকরা বলেন, আপনার মাকে আইসিইউতে নিতে হবে। তখন মায়ের জ্ঞান আছে, কথাও বলছেন। আমি বললাম, তাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না, আইসিইউতে নিতে হবে। এসময় চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার জন্য আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। বিএসএমএমইউতে আইসিইউ খালি না থাকায় মাকে মগবাজারের ইনসাফ কিডনি হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানকার চিকিৎসক ফখরুল সাহেব বলেন, আপনার মায়ের কিডনি কেন ফাংশন করছে না তা জানা দরকার, এজন্য সিটিস্ক্যান করতে হবে। তার কথা অনুযায়ী আমি মায়ের সিটিস্ক্যান করাই।’

রফিক শিকদার বলেন, ‘সিটিস্ক্যানের পর ল্যাবএইডের চিকিৎসকরা বলেন, আগের কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে আপনার মায়ের বাম কিডনি কেটে ফেলা হয়েছে। কিন্তু পরীক্ষার পর দেখা যাচ্ছে ডানের কিডনিও নেই। কিডনিটা কোথায় গেল? ওটা কি ফেলে দেওয়া হয়েছে? আমি বললাম, তাতো জানি না! এরপর ইনসাফ হাসপাতালের চিকিৎসক ফখরুল স্যারও দেখে বললেন, আপনার মায়ের পেটে কোনো কিডনি নেই। যদি কিডনি থাকত তবে আমি চিকিৎসা করতে পারতাম। যেহেতু তার পেটে কিডনিই নেই সুতরাং আমি তার কী চিকিৎসা করব। এরপর মাকে আবার বিএসএমএমইউতে নিয়ে আসি।’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক হাবিবুর রহমান দুলাল বলেন, ‘এর আগে তার দুটি অপারেশন হয়েছিল। তার কিডনিতে প্রচুর পুঁজ জমায় ৫ তারিখ অস্ত্রোপচার করে তার বাম দিকের কিডনিটা ফেলে দেয়া হয়।’

কিডনি না থাকার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাম দিকের কিডনির অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে ডান দিকের কিডনি ফেলে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটতেই পারে না। অনেক সময় এমন হয়, একটি কিডনির অস্ত্রোপচারের পর হয়তো অন্যটি সাময়িক কিংবা পার্মানেন্ট বিকল হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে হয়তো পেটে থাকা কিডনিটি সিটিস্ক্যানে ধরা নাও পড়তে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ৩ সপ্তাহ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত কিডনি নন-ভিজ্যুয়াল থাকতে পারে।’

অপরেশনের আগে বাম কিডনিটি নষ্ট হয়ে থাকলে সেটি সিটিস্ক্যানে ধরা পড়লে অপারেশনের পর ডান দিকের কিডনিটা ধরা পড়বে না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রোগীর স্বজনরা সিটিস্ক্যানের পর আল্ট্রাসনোগ্রামও করেছিলেন বলে জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে কিডনি দৃশ্যমান হওয়ার কথা। কিন্তু অনেকক্ষেত্রে অপারেশনের পর এমন হতে পারে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি ও মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তাদের তদন্তে মূল বিষয়টি উঠে আসবে।’

এ বিষয়ে বিআরবি হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞ এম এ সামাদ বলেন, ‘অপারেশনের পর রোগীর পেটের কিডনি সিটিস্ক্যান ও আল্ট্রাসনোগ্রামে অদৃশ্যমান হবে না, এটি সম্ভব নয়। রোগীর পেটের যেকোনো বস্তুই সিটিস্ক্যানে উঠে আসবে। অস্ত্রোপচারের পর কিডনি দৃশ্যমান হতে তিন সপ্তাহ থেকে তিন মাস সময়ের দরকার; এমন কোনো তথ্য চিকিৎসাশাস্ত্রে আছে বলে আমার জানা নেই।’

কিডনি উধাওয়ের বিষয়ে রফিক শিকদার বলেন, ‘যেহেতু আমার মায়ের দুটি কিডনিই পেটে অনুপস্থিত তাই আমার মনে হচ্ছে তারা বাম দিকের কিডনির অপারেশন করতে গিয়ে ডান দিকের কিডনিতে কোনো সমস্যার সৃষ্টি করেছেন এবং সেটি ঠিক করতে না পারায় দুটো কিডনিই ফেলে দিয়েছেন। অথবা ডান দিকের কিডনিটি অন্য কোনো রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করেছেন।’

রফিক শিকদারের মায়ের কিডনি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে শনিবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিএসএমএমইউ’তে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি ও ছয় সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তবে ওই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে প্রকৃত বিষয়টি উঠে না আসলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছেন রফিক শিকদার।

উৎসঃ   সময় নিউজ
print

LEAVE A REPLY