সম্রাট আওরঙ্গজেব, দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ

১৬৮০-এর দশকে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল মুঘল শাসক আওরঙ্গজেবের অধীনে। ইংরেজরা বাণিজ্য করতে এসে অন্য ইউরোপীয় দেশগুলির চাইতে বেশি সুবিধা চাইলে আওরঙ্গজেব সেটা মেনে নেননি। এ সময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর ছিলেন জোসাইয়া চাইল্ড, যার ঔদ্ধত্যের কারণে ব্রিটিশরা আওরঙ্গজেবের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ ইতিহাসে ‘চাইল্ড’স ওয়ার’ বলে পরিচিত। তারা ভারত থেকে হজযাত্রায় যাওয়া এক জাহাজ লুট করে এবং যাত্রীদের খুন-ধর্ষণ করে।

ব্রিটিশরা বাংলাকে তথা পুরো ভারতবর্ষকে নৌ অবরোধে ফেলার চেষ্টা করে। তারা হুগলী নদীর ওপরে একটা দ্বীপ দখল করে সেই নদী নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। কিন্তু ইংরেজদের এই অবরোধ সফল হয়নি, কারণ ভারতের প্রধান প্রদেশ বাংলা বহিঃবাণিজ্যের ওপরে নির্ভরশীল ছিল না। অবরোধ দেবার কারণে বাংলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কেউই না খেয়ে মরার উপক্রম হয়নি।

এই ঘটনার মাধ্যমে সমুদ্রবন্দর অবরোধ দেয়ার একটা কৌশল ব্রিটিশরা জানিয়ে দিয়েছিল। আর সেই অবরোধ তারা দিয়েছিল সমুদ্রবন্দরের বাইরে দ্বীপে ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ঘাঁটির দরকার হয়েছিল, কারণ সমুদ্রে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত থাকা সম্ভব নয়। রসদ নেবার জন্য সব চাইতে কাছের গন্তব্যটিও যদি অনেক দূরে হয়ে থাকে, তাহলে অবরোধ ধরে রাখা সম্ভব নয়। সেকারণেই হুগলীর সেই দ্বীপ দখল দরকার হয়েছিল।

তিন শতক পরে…

তিন শতাধিক বছর আগে ব্রিটিশদের দেখানো কৌশলের একটা অন্য ভার্সন আমরা দেখতে পাই ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে, যেখানে মার্কিনরা ভিয়েতনামের মেকং নদীর বদ্বীপ এলাকাসহ ভিয়েতনামের পুরো উপকূল নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামের তাঁবেদার সরকারের জাহাজগুলিকে গেরিলাদের হাত থেকে রক্ষা করা ছাড়াও গেরিলাদের সাপ্লাই লাইনে অবরোধ দিয়েছিল। এই অবরোধ দিতে গিয়ে আমেরিকানরা মেকং নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে কিছু ভাসমান ঘাঁটি তৈরি করা ছাড়াও ভূমিতেও বদ্বীপের কৌশলগত এলাকাগুলিতে ঘাঁটি বানিয়েছিল, যেগুলি থেকে গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটগুলি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

গেরিলারা স্থলপথ এবং নদীপথে নিয়মিত এসব ঘাঁটি আক্রমণ করতো ঠিকই, কিন্তু ঘাঁটিগুলি বন্ধ করে দেবার মতো শক্তি তারা কখনোই যোগাড় করতে পারেনি। ঘাঁটিগুলির অনেকগুলিই খুব দুর্গম জংলা এলাকায় ছিল, যেখানে ঘাঁটি রক্ষা করাটা অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল।

কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এ ধরনের ঘাঁটি রক্ষা করার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গুয়াদালক্যানাল-এর যুদ্ধ থেকে। এই দ্বীপখানার নামও কেউ জানতো না এক সময়। কিন্তু যে মুহূর্তে মার্কিন ম্যারিন সেনারা এই দ্বীপে নেমে জাপানিদের নির্মিতব্য ঘাঁটিটি দখল করে নেয়, তখন থেকেই এটা ইতিহাসের অংশ। জংলা এই দ্বীপের ঘাঁটিটি মার্কিনরা ব্যবহার করে বিমান এবং নৌঘাঁটি হিসেবে, যা কিনা প্রশান্ত মহাসাগরে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জাপানিরা বহুবার চেষ্টা করেছিল দ্বীপে অবতরণ করে ঘাঁটিটি দখল করে নিতে; কিন্তু জঙ্গলের বাস্তবতা এবং মার্কিনিদের প্রতিরোধের কারণে জাপানিরা অবশেষে ঘাঁটি দখল করার এই চিন্তাটি বাদ দিয়েছিল।

পরবর্তীতে আমেরিকানরা এই ঘাঁটিকে ব্যবহার করে সোলোমন দ্বীপপুঞ্জের বেশিরভাগ দ্বীপ দখল করেছিল। গুয়াদালক্যানাল প্রমাণ করে যে, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপরে যদি এমন একটা সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা যায়, যেটা দুর্গমতার কারণে রক্ষা করা সহজ, তাহলে সেই ঘাঁটিটি কৌশলগত দিক থেকে যুদ্ধের মোড় ঘোরাতে সক্ষম।

দ্বীপ পুনর্দখল কি এতটাই কঠিন?

একটা দ্বীপের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, সেটা দখল করতে হলে নদী বা সমুদ্রপথে আক্রমণ ছাড়া গতি নেই। আর যদি দ্বীপটি জঙ্গল বা পাহাড়-বেষ্টিত হয়, তবে সেটা দখল করাটা আরও বেশি কঠিন। ব্রিটিশরা এই একই কারণে জিব্রালটার দখলে রাখতে পেরেছে এতকাল। স্থলভাগের দিকে পাহাড়-বেষ্টিত থাকায় এর নৌঘাঁটিটি সমুদ্রপথে আক্রমণ করে দখল করা ছাড়া গতি নেই। আমেরিকানরাও কিউবার গুয়ান্তানামো বে-তে একটা ঘাঁটি রেখে দিয়েছে একইভাবে। উঁচু পাহাড়-বেষ্টিত এই ছোট্ট ঘাঁটিটি কিউবানরা দখল করে নিতে চেষ্টাও করেনি তেমন একটা।

সপ্তদশ শতকে ব্রিটিশরা যখন হুগলীর দ্বীপে বাণিজ্য জাহাজ দখল করার অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো বসে ছিল, তখন সুন্দরবনের রোগ-বালাই আর সুপেয় পানির অভাব তাদের পেয়ে বসে। বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খান মৃতপ্রায় ব্রিটিশদের ওই দ্বীপ থেকে উদ্ধার না করলে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। পরবর্তীতে যুদ্ধ বন্ধ করতে গিয়ে ব্রিটিশ অফিশিয়ালরা (কর্মকর্তা) আওরঙ্গজেবের দরবারে গিয়ে নাকে খত দিয়েছিল! কিন্তু মনে রাখতে হবে যে হুগলী নদীর সমুদ্র বাণিজ্য তখন বাংলার জন্য বাঁচা-মরার ব্যাপার ছিল না। তাই ব্রিটিশদের কাছ থেকে ওই দ্বীপ পুনর্দখল করাটাও বাঁচা-মরার লড়াই ছিল না। যদি উল্টোটা হতো, তাহলে কিন্তু শায়েস্তা খানের জন্য সুন্দরবনের ভিতরে অভিযান চালিয়ে ওই দ্বীপ পুনর্দখল করাটা বেশ কঠিন হতো। এবার এই দ্বীপের ব্যাপারটা আমরা বাংলাদেশের বদ্বীপের ক্ষেত্রে চিন্তা করলে কী দেখি?

দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ

পসুর নদীর ভেতরে বাংলাদেশের মংলা সমুদ্রবন্দর। আর এই নদী যেখানে সমুদ্রে মিশেছে, সেখানে রয়েছে কিছু জংলা দ্বীপ, যা কিনা এই নদীর মুখ, তথা এই সমুদ্রবন্দরের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে রয়েছে। দুবলার চর এবং হিরণ পয়েন্ট এই চ্যানেলের নিয়ন্ত্রক। কোনো বহিঃশত্রু যদি কখনো মংলা বন্দরকে অবরোধ দেবার চিন্তা করে, তবে তারা এই দ্বীপগুলিকে নিয়ন্ত্রণের চিন্তা করবে। একটা অবরোধের প্রধান দিক হলো Sustainability (টিকে থাকা)। আর সেটা সম্ভব করতেই নদীমুখে একটি দ্বীপ অপরিহার্য। শুধু সমুদ্রের ওপরে নির্ভর করে অবরোধ চালিয়ে নেয়াটা যে কারো জন্যই কঠিন। আর কেউ যদি ঝটিকা আক্রমণের মাধ্যমে এই দীপগুলি বা আশপাশের কোনো একটি জবরদখল করে নেয়, তাহলে সেটা পুনর্দখল করাটাও প্রচণ্ড কঠিন হবে। তবে সঠিকভাবে ধরে রাখার ব্যবস্থা করলে সেটা আবার বহিঃশত্রুর পক্ষে দখল করে নেয়াটা বেশ কঠিন হবে।

একই রকমের উদাহরণ হচ্ছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। এই দ্বীপ চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ রুটগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। আবার মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা থাকার কারণে একবার বেদখল হয়ে গেলে পুনর্দখল করাটা ভীষণ কঠিন হবে। কেউ এই দ্বীপ দখলে নিলে একই সাথে টেকনাফের দক্ষিণ প্রান্তে শাহপরীর দ্বীপের কিছু পাহাড়ী এলাকাও দখলে নিয়ে রাখতে চাইবে। কারণ এই উঁচু এলাকা থেকে এখানকার সমুদ্রপথ এবং টেকনাফের রাস্তাগুলি অবলোকন করাটা সহজ। দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিনের মতো দ্বীপগুলিতে স্পেশাল ফোর্স, আর্টিলারি, দ্রুতগামী শক্তিশালী প্যাট্রোল বোট এবং আর্মড হেলিকপ্টার মোতায়েন করে কোনো বহিঃশত্রু বাংলাদেশের প্রধান দুই বন্দরকে অবরোধ দিতে সক্ষম হতে পারে। এ কারণেই এই দ্বীপগুলিকে কালক্ষেপণ না করে সুরক্ষার ব্যবস্থা করাটা জাতীয় নিরাপত্তার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

সপ্তদশ শতকের মতো পরিস্থিতি এখন নেই যে সমুদ্র অবরোধে এদেশের কোনো ক্ষতি হবে না। সমুদ্রপথে আমদানির ওপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল এই দেশকে অবরোধ দেবার পদ্ধতিটাই কোনো আগ্রাসী শক্তির জন্য ইকোনমিক্যাল হবে। আর বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বিদেশি কোনো শক্তি এই দেশে কোনোভাবেই তাদের আগ্রাসী তৎপরতা চালাবে না – এ রকম পদলেহনকারী চিন্তা এখন ধোপে টেকে না।

দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিনের মতো দ্বীপগুলিকে সুরক্ষা দিতে গেলে অনেক ধরনের বাধা আসবে। কিন্তু যারা বাধা দেবেন, তারা কখনোই এই দ্বীপগুলির কৌশলগত দিক চিন্তা করবেন না, অথবা চিন্তা করার পরও বলবেন যে, বিদেশি শক্তিদের তোষণ করে চলার মাঝেই এই দেশের ‘নিরাপত্তা’ নিহিত। নিজেদেরকে দুর্বল ভেবে অন্যের স্বার্থের কাছে সঁপে দিতেই তারা স্বাছন্দ্য বোধ করেন। এই দ্বীপগুলির সুরক্ষা দিতে চাইলেই এরা বিদেশি Subversion-এর অংশ হয়ে নানা প্রকারে বাধার সৃষ্টি করবেন। ওপরে কৌশলগত যতগুলি দ্বীপের উদাহরণ দিয়েছি, তার কোনোটিতেই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি জাতীয় নিরাপত্তার বাইরে কোনো কিছুকে প্রাধান্য দেয়নি; আমাদেরও দেওয়া উচিত হবে না।

আহমেদ শরীফ

লেখক: ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক

উৎসঃ   poriborton
print

LEAVE A REPLY