নেপালে ভূমিকম্পের পেছনে রয়েছে নগ্নতা ও নৈতিক অধঃপতন : দেব-দেবীরা রাগান্বিত

Nepalহিমালয়ের দেশ নেপালে ধ্বংসকা-েরর জন্য কেউ কেউ দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের দায়ী করছেন। অন্যরা এজন্য পশ্চিমা পর্যটকদের অর্ধনগ্ন হওয়া ও নৈতিক অধঃপতনকে দোষারোপ করছেন। তবে, এক সপ্তাহ আগে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে নেপালে যে ভয়বহতা তৈরি হয়েছে তা দেখে দেশটির ধর্মপ্রাণ মানুষদের অধিকাংশের মনেই একটি ধারণা স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো, দেব-দেবীরা রাগান্বিত। বর্তমানে নেপালের পবর্তচূড়ার মন্দিরগুলোতে অনেকেই শান্তি খুঁজে পাচ্ছেন বলে মনে করেন। তারা আরও মনে করেন, যে ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষ মরল এবং হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হলো তার পেছনে অবশ্যই কারণ রয়েছে। গোর্খা কালিকায় কালীমন্দিরের ৫১ বছর বয়সী পুরোহিত ঈশ্বরনাথ যোগী বলেন, “ভূমিকম্প রাজনীতিকদের জন্য দেব-দেবীদের থেকে একটি সতর্কবার্তা। আর তা হলো, তোমরা সংশোধিত হও। অথবা ঈশ্বর জানেন কী ঘটবে।” ঈশ্বরনাথ যোগীর দৃঢ়বিশ্বাস যে, ২৫ এপ্রিল ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের সময় মৃত্যু ও ধ্বংসের দেবী তাকে এবং যারা ১৭ শতকের ওই মন্দিরে প্রার্থনা করছিলেন তাদের রক্ষা করেছেন। তিনি আরও বলেন, যাদের ভাগ্যে দুর্ভোগ তারা হতভাগা। সম্ভবত তারা পর্যাপ্ত পূজা-অর্চনা  করেনি অথবা তারা তাদের পবিত্র পশুকে বলী দেয়নি। হতে পারে তারা পশ্চিমা সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি জলাঞ্জলি দিয়েছেন। “আমরা হিন্দু জাতি,” উল্লেখ করে ঈশ্বরনাথ যোগী তার ব্যাখ্যায় বলেন, নেপাল এমন একটি জায়গা যেখানে পোশাক পরিচ্ছদে রক্ষণশীলতা বজায় রাখা হয়। কিন্তু “আমেরিকান, জাপানিদের দিকে তাকাও, তারা অর্ধনগ্ন হয়ে চারিদিকে ছোটাছুটি করছে। যে কারণে দেব-দেবীরাও রেগে গেছেন।” নেপালের ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষের তিন-চতুর্থাংশই হিন্দু এবং দেশটিতে অগণিত মন্দির ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। হিন্দুদের দেবতা বিষ্ণুর প্রতিনিধি বিবেচনা করে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজাকে পূজা করে আসছে। এমনকি নেপাল সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আধুনিক হলেও দেশটিতে বিরাজমান পুরাতন বিশ্বাসগুলো এখনও প্রতীয়মান হয়। অধিকাংশই নেপালি খুবই গরিব এবং তারা প্রধানত কৃষি ও পশু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে।  দেব-দেবীরা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করেন- এটি নেপালিদের সাধারণ বিশ্বাস। দেশটিতে নদী, গাছ ও পর্বত চূড়ায় থাকা পশুদের পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং প্রতিটা বাড়িতে মূর্তি দেখা যায়। এছাড়া পর্বত চূড়ার মন্দিরগুলোর উদ্দেশে তীর্থযাত্রাকে আধ্যাত্মিকতা অর্জন ও পাপমোচনের পন্থা বলে বিবেচনা করা হয়। ২৩ বছর বয়সী সুষমা কানওয়ার তার কোলে একটি শিশুকে নিয়ে উপত্যকায় দাঁড়িয়ে পাহাড় চূড়ার কালীমন্দিরের দিকে তাকিয়ে বলেন, “আমার ঈশ্বর ওখানে থাকেন।” তিনি আরও বলেন, “কেউ কেউ গুরুতর পাপ করেছেন। আর যার কারণের দেব-দেবীরা নাখোশ হয়েছেন। এখানে চুরি, দুর্নীতি, হত্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।” নেপালে ২০০৬ সালে মাওবাদী বিদ্রোহীদের রক্তাক্ত তা-বের অবসান হয়, তবে এর ক্ষত সারতে এখনও হিমশিম খাচ্ছে। এটি বিশ্বে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ও দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর একটি। দেশটিতে মাথাপিছু আয় মাত্র ৭১২ ডলার। ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে অফিসিয়ালভাবে দেশটি হিন্দু রাষ্ট্র ছিল তবে ২০০৭ সালে এটিকে সেক্যুলার প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করায় অনেকেই পরিতাপ করেন। এবারের ভূমিকম্পে কানওয়ার ও তার পরিবার তাদের বাড়িসহ এর মাঝে থাকা সবকিছুই হারিয়েছেন। তিনি বলেন, “গ্রামের প্রত্যেকের বাড়ি ধ্বংস হয়েছে; কিন্তু কেউ মারা যায় নি। এটি দেবীর আশীর্বাদ।” ভূমিকম্পের পর মন্দিরের শহর মনোকামনায় একই ধরনের বিশ্বাস ও ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। ভূমিকম্প বিধ্বস্ত গোর্খার আরেকটি তীর্থস্থানের ৭২০০ বাসিন্দার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। হাজার হাজার পর্যটক ভূমিকম্পের দিন মন্দির চত্বরে আশ্রয় নেন। ওই দিন কংক্রিটের ভবন ধসে পড়ে। এমনকি মন্দিরের ইটের দেয়াল ভেঙে পড়ে। স্থানীয়রা মনে করছেন, ক্ষয়ক্ষতি কম হওয়ার কারণ হলো ১৭ শতকের মন্দিরের দেবী ভগবতীর আশীর্বাদ। দিনে প্রায় ১০ হাজার মানুষ এই দেবীর কাছে পূজা করতে যায়। হোটেল মালিক দিনেশ জোশি (৪৩) বলেন, “আমরা মনে করি ভগবতী আমাদের রক্ষা করেছেন। তিনি রক্ষা না করলে কীভাবে আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি যে, কেউ কেন আহত হলো না?” সূত্র: এপি

print

LEAVE A REPLY