চিলির জাতীয় দলে বাংলাদেশের শোয়েব

দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের দেশ চিলিতে হাতেগোনা ৫০-৬০ জন বাংলাদেশীর বসবাস রয়েছে। তাদেরই একজন শোয়েব গাজী। যিনি নিজের যোগ্যতায় জায়গা করে নিয়েছেন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার প্রতিবেশী দেশ চিলির জাতীয় ক্রিকেট দলে। ২০১৬ সালে সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ ক্রিকেটে ব্রাজিলের বিপক্ষে চিলির জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয় এই মিডিয়াম পেসারের।

চিলির রাজধানী সান্টিয়াগোর ইউনিভার্সিটি অব চিলি থেকে স্প্যানিশ ভাষায় উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার পর ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটিতে এমবিএতে ভর্তি হন শোয়েব। ২০১৬ সালে স্থানীয় স্টেশান সেন্টার ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে লিগে তার অভিষেকেই প্রথম ম্যাচের প্রথম ওভারেই মাত্র ১ রানে ২ ব্যাটসম্যানকে বোল্ড করে নজর কাড়েন চিলির জাতীয় নির্বাচকদের। জাতীয় লিগে ধারাবাহিক সাফল্যের পর ২০১৬ সালেই শোয়েব গাজীর ডাক আসে চিলি জাতীয় দলের হয়ে খেলার।

ওই বছর নভেম্বরে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ ক্রিকেটে আইসিসির আরেক সহযোগী সদস্য দেশ স্বাগতিক ব্রাজিলের বিপক্ষে চিলির হয়ে মাঠে নামেন তিনি। ব্রাজিলকে হারিয়ে শুভ সূচনা করার পর মেক্সিকো, পেরু ও কলম্বিয়াকে হারায় চিলি। আর্জেন্টিনার সাথে গ্রুপ ম্যাচে হারলেও ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েই শিরোপা জয় করে চিলি। সেই সাথে ল্যাটিন আমেরিকার ক্রিকেট ইতিহাসে লেখা হয় লাল-সবুজের শোয়েবের নাম।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সহযোগী সদস্য দেশ চিলির জাতীয় ক্রিকেট লিগ মাতানো শোয়েবের জন্ম বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। বাবা মরহুম মাহাবুব রাব্বানি ছিলেন রামগঞ্জ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল। স্থানীয় মাদরাসায় পড়ার সময় ২০০২ সালে বিকেএসপির অধীনে লক্ষ্মীপুরে অনূর্ধ-১৬ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ছিলেন। দাখিল পাসের পর ঢাকায় এসে যাত্রাবাড়ীর তামিরুল মিল্লাত মাদরাসা থেকে আলিম পাস করেন। এরপর ধানমন্ডির স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে বিবিএ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্প্যানিশ ভাষায় ডিপ্লোমা নিয়ে ২০১৫ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান চিলিতে।

বর্তমানে পেরু-বলিভিয়া সীমান্তে বাণিজ্যিক নগরী ইকিকের একটি অটোমোবাইল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ শাখায় ফুলটাইম কাজ করছেন শোয়েব।

আরো পড়ুন: টেস্ট অভিষেকের জন্য প্রস্তুত সিলেট

শনিবার সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম টেস্ট খেলতে নামবে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে। এ ম্যাচের মধ্য দিয়েই নয়নাভিরাম এই মাঠে অভিষেক হচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটের।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), স্থানীয় বিভাগীয় ক্রিকেট সংস্থা ও আইন-শৃংখলা বাহিনী খেলা আয়োজনের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ম্যাচটি উপভোগ করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন সিলেটের ক্রিকেটপ্রেমীরা।

অভিষেক টেস্টটি স্মরণীয় করে রাখতে কিছু বিশেষ উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন বিসিবি পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। বলেছেন, সব ধরনের প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। প্রচার-প্রচারণা ও সার্বিক আইনশৃংখলা প্রস্তুতি নিয়ে আমরা কাজ করছি। অতীতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাবো।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার মধ্যকার টোয়েন্টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দিয়ে এ মাঠে বাংলাদেশ জাতীয় দলের অভিষেক হয়। এবার ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণ টেস্ট ভার্সনের অভিষেক হতে যাচ্ছে।

২০১৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কয়েকটি ম্যাচ হয় সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। এরই মধ্যে বেশ কিছু টুর্নামেন্ট আয়োজনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে। চলতি বছর বিপিএল এর পঞ্চম আসর আয়োজনের পাশাপাশি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে শ্রীলংকা ‘এ’ ও বিসিবি ‘এ’ দলের কয়েকটি খেলা এবং এনসিএল এর সিলেট ও ঢাকা মেট্রোর মধ্যকার লংগার ভার্সনের ম্যাচ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শ্রীলংকা-বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি খেলার অভিষেক এই মাঠে। এসব আয়োজনের অভিজ্ঞতা ৩ নভেম্বরের টেস্ট ম্যাচে কাজে লাগাতে চান আয়োজকরা।

‘বিশেষ কয়েন’ দিয়ে হবে টস : যেহেতু সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে এই প্রথম টেস্ট ম্যাচ আয়োজন হতে যাচ্ছে তাই বিশেষ কয়েনে টস করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিসিবি পরিচালক নাদেল। কয়েনের দুই পাশে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট বোর্ডের লোগো ব্যবহার করা হবে। এছাড়া জিম্বাবুয়ে দলের অধিনায়ক ও কোচকে সিলেটের ঐতিহ্যখচিত ক্রেস্ট উপহার দেওয়া হতে হবে।
চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি এই মাঠে বাংলাদেশ জাতীয় দল প্রথম কোন টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে। ম্যাচটি হয়েছিলো শ্রীলংকার বিপক্ষে। ক্রিকেটের ছোট্ট সংস্করণে এই মাঠে জাতীয় দলের অভিষেক ম্যাচটি স্মরণীয় করে রাখতে বিসিবি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল। সে কয়েনটি সংরক্ষণের কথাও জানান বিসিবি পরিচালক।

ম্যাচে ফল বের হবে- ৩ নভেম্বরের টেস্ট ম্যাচের প্রস্তুতি হিসেবে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চলছে পরিচর্যার কাজ। মাঠের দায়িত্বে আছেন কিউরেটর (তত্ত্বাবধায়ক) সনজীব আগারওয়াল। সিলেটের মাঠের প্রশংসায় পঞ্চমুখ এই তত্ত্বাবধায়ক জানালেন, সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি অত্যন্ত চমৎকার। মাঠটি এমনভাবে তৈরি বৃষ্টি হলেও পানি সহজে নেমে যায়।

সনজীব আগারওয়াল বলছেন, নতুন মাঠ হলেও ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো সিলেটের উইকেট যথেষ্ট ভাল। যে কারণে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ের মধ্যকার টেস্ট ম্যাচটি হবে ‘রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড’। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ‘এ’ ও শ্রীলংকা ‘এ’ দলের সিরিজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। চলতি মাসে জাতীয় ক্রিকেট লীগের ঢাকা মেট্রো বনাম সিলেটের মধ্যকার টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় এ মাঠে। ম্যাচগুলো বেশ ভাল হয়েছে।

সিলেটে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি বৃষ্টি হওয়ায় মাঠটি সেভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে জানিয়ে টি-টোয়েন্টির পর টেস্ট ম্যাচ আয়োজনের সুযোগকে সিলেটের জন্য সুবর্ণ সুযোগ এবং মাইলস্টোন হিসেবে দেখছেন তিনি।

বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ৬টি অনুশীলন পিচ ও ৭টি উইকেট রয়েছে। উইকেটগুলো সার্বক্ষণিক রক্ষণাবেক্ষণের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন বিসিবি’র নিয়োগ দেওয়া একজন কিউরেটর।

বিশেষ আকর্ষণ গ্রিণ গ্যালারি : টিলা আর সবুজ চা বাগানে বেষ্টিত সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে মুগ্ধ হবেন যে কেউ। জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটার মাশরাফি, বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব, তামিম-মুশফিক-মাহমুদুল্লাহ সবাই অভিভূত। বাংলাদেশে এরকম সুন্দর একটি স্টেডিয়াম অনেকের কাছেই অজানা।

স্টেডিয়ামটির একপ্রান্তে আছে গ্রিন গ্যালারি। টিলায় স্তরে স্তরে সিঁড়ির মতো করে সাজানো গ্যালারিতে সবুজ ঘাসের উপর বসে খেলা উপভোগ করার সুযোগ বাংলাদেশে শুধু এই মাঠেই রয়েছে। বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান ও খালেদ মাসুদ পাইলট চলতি বছর বিপিএল খেলার সময় মাঠটি ও আশপাশের পরিবেশ দেখে বলেছিলেন এই স্টেডিয়ামটি বাংলাদেশের মধ্যে অনন্য। বিদেশী খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা এই সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হবে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য এই মাঠটি খুব পছন্দ করবে।

সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক উপযোগিতা, দর্শকপ্রিয়তা ও পরিবেশের জন্য দেশের অন্যতম এই স্টেডিয়ামটি টেস্ট আয়োজনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। টেস্টে সিলেট স্টেডিয়াম অভিষিক্ত হলেই আরেকধাপ এগিয়ে যাওয়া। বাকি শুধু ওয়ানডে অভিষেক।

সিলেট জেলা ক্রিকেট কোচ মো. রানা মিয়া বলেন, সিলেটের ক্রীড়াঙ্গনে তথা বাংলাদেশের জন্য এটি সুখবর। বাংলাদেশ একটি মানসম্মত ভেন্যু পেয়েছে। এই টেস্ট ম্যাচ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম আরেক মাইলফলক স্পর্শ করবে। আমরা উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছি।

সিলেটের ক্রীড়াবিদরা বলছেন, চলতি বছরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের একটি ম্যাচ দিয়ে এই মাঠে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছে। একই বছরে টেস্ট আয়োজন হচ্ছে। এই বছরের মধ্যেই ওয়ানডে ম্যাচ আয়োজনের কথা রয়েছে। বছরটি সত্যিই সিলেটবাসীর জন্য বড় পাওয়ার।

NayaDiganta
print

LEAVE A REPLY