ফের ৫ জানুয়ারির কৌশল নিলে সংকট বাড়বে

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ। রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

নির্বাচন, সংলাপ ও রাজনীতির চলমান প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে পরিস্থিতি ফের সংঘাতের দিকে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথমটি থাকছে আজ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

সংলাপেই সমাধান- এমন মানসিকতা রাজনৈতিক মহলে এখনও তৈরি হয়নি

জাগো নিউজ : রাজনীতি এখন সংলাপমুখী। কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন সংলাপের রাজনীতি?

হোসেন জিল্লুর রহমান : চলমান রাজনীতির যে প্রতিযোগিতা, তার মধ্যে সংলাপ রেখে আলোচনা করাই শ্রেয়। সংলাপকে আলাদা করে মূল্যায়ন করলে রাজনীতির অন্য বিষয় চাপা পড়ে যায়।

নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হতে দেবে কি না- এটিই এখন রাজনীতির প্রধান ইস্যু। অন্যদিকে কোন রাজনৈতিক কৌশলে বিরোধীপক্ষকে আরও দুর্বল করা যায়, তা হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের কাছে আরেকটি ইস্যু। এ দুটি বিষয় একবারে পরিষ্কার এবং এ নিয়ে রাজনীতিতে ছায়া বক্সিং চলছে।

সবকিছু রেখেও সরকারের মধ্যে জনমত প্রশ্নে শঙ্কা কাজ করছে

জাগো নিউজ : এমন ছায়া বক্সিং আগেও ছিল। এবার ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে হলে কী বলবেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান : প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংকট কাটিয়ে ওঠা অনেকটাই সহজ ছিল। সে প্রেক্ষাপট এখন ভিন্ন। এবার প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের আলামত দেখতে পাচ্ছি।

জাগো নিউজ : কিসের আলামত পাচ্ছেন, যা প্রেক্ষাপট আলাদা করে তুলছে?

হোসেন জিল্লুর রহমান : বিরোধীপক্ষ নির্বাচনে অংশ না নিলেও ২০১৪ সালে সরকার এক ধরনের ব্যাখ্যা তৈরি করেছিল, যা নির্বাচনে বৈধতার ঘাটতি থাকলেও দেশি-বিদেশি সমর্থন পাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল।

রাজনীতির অন্য প্রবণতাগুলোর কারণে সংলাপ তুলনামূলক গুরুত্বহীন হয়ে গেছে

সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, প্রধান প্রতিযোগী বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিতে বলা এবং বিরোধীপক্ষের ভাবমূর্তির অভাব- এই তিন কারণে সরকারি দল বিশেষ অবস্থান তৈরি করে ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এরপরও সরকার মধ্যবর্তী একটি নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। এর মধ্য দিয়ে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য না হলেও স্বল্প গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যার সফল উপস্থাপন করতে প্রয়াস চালায় সরকার। বিদেশি একটি শক্তিও সরকারকে সমর্থন করেছিল প্রত্যক্ষভাবে।

জাগো নিউজ : একই অবস্থা এখনও চলমান?

হোসেন জিল্লুর রহমান : ঠিক তা নয়। প্রধান প্রতিযোগী নির্বাচন বয়কটের পরিবর্তে এবার অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী। আলোচনা হচ্ছে, বিরোধিতা হচ্ছে, এরপরও বিরোধীপক্ষ নির্বাচনমুখী বলে মনে করা হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, এই মুহূর্তে বিরোধীপক্ষের চাইতে সরকারি দল ভাবমূর্তির সংকটে আছে, যা ২০১৪ সালের নির্বাচনের উল্টো ছিল। বৈধতার সংকট নিয়ে ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে গত পাঁচ বছর অতিমাত্রায় দমন-পীড়ন করেছে সরকার। আমরা নিরাপদ সড়ক ও কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে দমন-পীড়নের বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছি। এছাড়া দুঃশাসন আর দুর্নীতি সরকারের ভাবমূর্তি আরও সংকটে ফেলেছে।

১৫৪ জন সংসদ সদস্য গতবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করার যে কৌশল নিয়েছিল সরকার এবার তা সম্ভব হবে না বলে মনে করি। ফের ৫ জানুয়ারির কৌশল নিলে সংকট বাড়বে। এ নিয়ে সরকারও সজাগ বলে মনে হচ্ছে।

এ কারণে সরকার চাইছে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক, তবে প্রতিপক্ষকে যতটুকু দুর্বল করে রাখা যায় এবং ফলাফল সরকারের পক্ষে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা থাকবে। যদিও এ নিয়ে সরকারি দলের মধ্যেও টানাপোড়েন আছে।

জাগো নিউজ : এই টানাপোড়েন প্রশ্নে বিরোধীপক্ষের অবস্থান কোথায়?

হোসেন জিল্লুর রহমান : বিএনপি বা বিরোধীপক্ষও এক ধরনের টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। বিএনপি যে দাবি তুলেছে, তার মধ্যে নির্বাচন বয়কট করবে, কি করবে না- সে বিষয়ও রয়েছে। যেমন- বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিটি ধোঁয়াশার মতো। সরকারের কৌশলের কাছে বিএনপির নেতৃত্ব যে সংকটের মধ্যে আছে, তা অস্বীকার করার জো নেই। আইনি সংকট এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে বিএনপি আসলে কীভাবে হিসাব মেলাবে তা নিয়েও দ্বিধা আছে।

এ কারণে আপনি একটি সংলাপ থেকে সমাধান বা সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে পারবেন না।

জাগো নিউজ : আপনি সরকার এবং বিএনপির টানাপোড়েনের কথা বললেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে দিয়েছে কি-না?

হোসেন জিল্লুর রহমান : বিএনপি দীর্ঘমেয়াদে ভাবমূর্তির সংকটে ছিল। সে সংকটের খানিকটা এখনও আছে। এ কারণে সরকার তাদের একঘরে করে ফেলার সুযোগ পেয়েছিল। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর সেই সংকট থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়েছে বলে ধারণা করা যায়।

এই পরিস্থিতিতে সংলাপকে আমি ছায়া বক্সিংয়ের সঙ্গে তুলনা করতে চাই। অর্থাৎ মূল লড়াই বা প্রতিযোগিতার আগে এদিক-ওদিক একটু লড়াই করে নেয়া চলছে মাত্র। সংলাপটা ঠিক তাই। ড. কামাল হোসেনের চিঠি, প্রধানমন্ত্রীর জবাব, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সবটাই দেখতে হবে ছায়া বক্সিংয়ের মতো করে। সংলাপেই সমাধান- এমন মানসিকতা রাজনৈতিক মহলে এখনও তৈরি হয়নি।

সংলাপের চমক অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। সংলাপ প্রসঙ্গ কাটিয়ে রাজনীতি ফের আগের জায়গায় ফিরতে চাইছে। এখন প্রধান প্রতিযোগী একঘরে হওয়ার সংকট কাটিয়ে কিছুটা নির্বাচনমুখী হতে আগ্রহী। অন্যদিকে ক্ষমতায় থাকতে সরকারও মরিয়া। এ দুটি বিষয় অন্তত এখন পরিষ্কার। সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, ২০১৪ সালের মতো করে আর নির্বাচন আয়োজন করতে পারছে না।

জাগো নিউজ : সরকার তো এখন অধিক আত্মবিশ্বাসী। রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে মাঠ নিয়ন্ত্রণ, বিরোধীপক্ষকে দমন-পীড়ন করে আগের থেকে শক্তিশালী। উন্নয়ন প্রশ্নেও এগিয়ে সরকার। তাহলে কেন মনে করছেন ২০১৪ সালের মতো আরেকটি নির্বাচন হবে না বা সরকার কেন চ্যালেঞ্জ নেবে না?

হোসেন জিল্লুর রহমান : সবকিছু রেখেও সরকারের মধ্যে জনমত প্রশ্নে শঙ্কা কাজ করছে। এর প্রমাণ হচ্ছে, সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সভায় আলোচনা হয়েছে যে, ৭০ এর অধিক এমপি ঝুঁকিতে রয়েছেন। জনমত গুরুত্ব না পেলে তো এমন আলোচনা হতে পারে না। তার মানে ওই ৭০ জন এমপির কর্মকাণ্ড ও জনসমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ ভয়ে আছে। এই ভয়ের অন্যতম কারণ হলো প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন।

নেতৃত্ব সংকট থাকলেও বিএনপি এখন নির্বাচনে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এর মধ্য দিয়ে বিএনপি এক ধরনের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিচ্ছে বলে মনে করি। ২০১৪ সালে পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বয়কটের (ওয়াকওভার) সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিএনপি। ২০১৮ সালে ওয়াকওভারের (বয়কট) পরিবর্তে আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছি। যদিও পরিস্থিতি ফের সংঘাতের দিকেও যেতে পারে। আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যেই আছি।

তবে চলমান রাজনৈতিক প্রবণতা থেকে বলা যায়, রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তাই হবে লড়াইয়ের অন্যতম হাতিয়ার। এক বছর পরে যখন আমরা ফিরে তাকাবো, তখন হয়তো আজকের সংলাপ পরিস্থিতি সঠিকভাবে মূল্যায়নের সুযোগ আসবে।

জাগো নিউজ : নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে। তাহলে এই ‘সংলাপ’ বা ‘ছায়া বক্সিং’ থেকে আমরা কী পাচ্ছি?

হোসেন জিল্লুর রহমান : সংলাপ থেকে যা প্রত্যাশা করা হয়, তা আমরা পাবো বলে মনে করি না। পরস্পরবিরোধী আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক বা গায়েবি মামলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন। এটি একটি মাত্র আলোচনা। আরও অনেক বিষয় আছে।

সুতরাং রাজনীতির অন্য প্রবণতাগুলোর কারণে সংলাপ তুলনামূলক গুরুত্বহীন হয়ে গেছে।

উৎসঃ   জাগোনিউজ
print

LEAVE A REPLY