খুব শিগগিরই দেখা যাবে দুনিয়া অচল : ড. ইউনূস

এখনই পথরেখা ঠিক না করলে ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে বিপর্যয় থেকে বাঁচানো যাবে না বলে সতর্ক করেছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পৃথিবী নামের এই গ্রহকে একটি মহাকাশ যানের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, এই যানের যাত্রীরা শুধু যাত্রী হয়ে থাকলে ভবিষ্যৎ গন্তব্যহীন। পৃথিবীকে সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়িয়ে গন্তব্যে নিতে হলে শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। বর্তমান বিশ্ব যে পথে এগোচ্ছে তাতে খুব শিগগিরই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। জার্মানির ওল্ফসবার্গে সোস্যাল বিজনেস একাডেমিয়া কনফারেন্সের ফাঁকে মানবজমিন- এর সঙ্গে আলাপে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বিশ্বে সম্পদের কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা একটি টাইমবোমার মতো অবস্থার দিকে যাচ্ছে। এটি যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়ে পৃথিবীর জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। একইভাবে পরিবেশ দূষণও হতে পারে ধ্বংসের আরেক কারণ।

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমি বলছি যে পৃথিবী একটা গ্রহ, যেটা একটা মহাকাশ যাত্রার স্পেসশিপ এর মতো। আমরা কি এটার যাত্রী, না আমরা এটার ক্রু? আমরা যদি যাত্রী হিসেবে বিবেচনা করি এটার কোনো চালক নেই, তাহলে এটা আমাদের ভয়ঙ্কর সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাবে। এটা নির্দিষ্ট কোনো স্থানে যাচ্ছে না। তো আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে যে আমরাই এটার ক্রু, আমরাই এটা পরিচালনা করি। আমরা যার যার পেশায় আছি আমাদের লক্ষ্য হবে এটাকে নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যাওয়া। আমি মনে করি আমরা যারা শিক্ষক, শিক্ষা প্রসারে নিয়োজিত আছি আমি তাদের বলছি পাইলট। তারা আসলে অনেকদূর ভবিষ্যৎ দেখতে পান, তারা পথ নিদের্শক। যে পথে আমরা চলছি বর্তমানে আমাদের পাইলটের নির্দেশে এটা একটা বিপর্যয়ের পথ, আমরা একটা ভয়াবহ পথের দিকে এগোচ্ছি। কারণ এটা যে দিকেই তাকাই মনে হয় এই শতাব্দী পার হবার মতো সময় হাতে নাই। তাই আমাদের গবেষক, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা যারা করেন, তাদের ঠিক করতে হবে আমাদের গন্তব্য কোন দিকে হবে। সেদিক থেকেই আমি বলছি, আমাদের নতুন গতিপথ ঠিক করতে হবে।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এই যে প্লাস্টিক, এমন অবস্থার দিকে চলে যাচ্ছে যে, শুধু প্লাস্টিকই আমাদের সর্বনাশ করে দিতে পারে। সার্বিক পরিবেশকে ধরলে দেখা যাবে এমন একটা অবস্থানে চলে যাচ্ছি তা চললে বড় জোর ২০ বছর বা ৩০ বছর টেনেটুনে ৩২ থকে ৩৫ বছর পার করতে পারবো। কিন্তু এ শতাব্দী পার করার মতো শক্তি নাই। আবহাওয়ার কারণেই আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। পৃথিবী আর বাসযোগ্য থাকবে না আমাদের জন্য।

তিনি বলেন, সমস্ত সম্পদ কেন্দ্রীভূতকরণ হচ্ছে। এটা এমন পর্যায়ে চলে গেছে এটা আর সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারবে না, নিজেই এটা ভেঙে পড়বে, এটা অনেকটা টাইম বোমের মতো। টাইম বোমের মতো বিস্ফোরণে চলে যাবে। খুব শিগগিরই দেখা যাচ্ছে আমরা অচল হয়ে যাচ্ছি, দুনিয়া অচল হয়ে পড়ছে। আমরা যন্ত্রের হাতে বন্দি হয়ে পড়ছি। এগুলো একেকটাই একটা সর্বনাশের পথ। তো আমাদের এগুলো থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে।

বিখ্যাত গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগনের সদর দপ্তরে মঙ্গলবার শুরু হওয়া দুইদিনের সম্মেলনের আয়োজক ইউনূস সেন্টার ও গ্রামীণ ক্রিয়েটিভ ল্যাব। সামাজিক ব্যবসায় আন্তঃবিভাগীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণাকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে এ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১২টি দেশ থেকে ইউনূস সোস্যাল বিজনেস সেন্টারের প্রতিনিধি হিসেবে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষাবিদ ও গবেষক এতে অংশ নিচ্ছেন। কনফারেন্সে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, সামাজিক ব্যবসায় অর্থায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১৯টি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন হবে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস কনফারেন্সের উদ্বোধন করেন।

সম্মেলনে গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ক্যাম ডোনাল্ডসন, ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট ফর সোস্যাল বিজনেসের পরিচালক প্রফেসর আন্দ্রে গ্রোভ, তাইওয়ানের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ইউনূস সোস্যাল বিজনেস সেন্টারের পরিচালক ড. মার্ক শেন, ফ্রান্সের সোস্যাল বিজনেস চেয়ারের পরিচালক প্রফেসর বেনেডিক্ট ফাব্রি তাভিগনট, অস্ট্রেলিয়ার লা ত্রোব বিজনেস স্কুলের ইউনূস সোস্যাল বিজনেস চেয়ারের পরিচালক প্রফেসর, ড. গিলিয়ান সুলিভান মর্ট, জার্মান ইউনিভার্সিটি অব উপের্টালের প্রফেসর ড. ক্রিস্টিন ভকম্যান, মালয়েশিয়ার সেন্টার অব সোস্যাল ইনোভেশনের প্রধান ড. শাহরিনা মুহাম্মদ নরদিন, মেক্সিকোর অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অব বাজা ক্যালিফোর্নিয়া প্রফেসর ড. আলেজান্দ্রো মুঙ্গারেসহ আরো অনেকে বক্তব্য রাখেন। যেসব দেশে সদ্য ইউনূস সোস্যাল বিজনেস সেন্টার চালু হয়েছে, তাদের প্রতিনিধিরাও কনফারেন্সে অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া, দু’দিনব্যাপী কনফারেন্সে সাংহাইয়ের জিয়াও তং ইউনিভার্সিটির প্রফেসর প্রদীপ কুমার রায় ‘সোস্যাল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ফর বেল্ট অ্যান্ড রোড কান্ট্রিস’ বিষয়ের উপর বিশেষ বক্তৃতা করেন। সামাজিক ব্যবসায় প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার বিষয়ে পরিপূরক বক্তৃতা ছাড়াও কনফারেন্সে গ্রুপভিত্তিক আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারীরা।

সোস্যাল বিজনেস অ্যাকাডেমিয়া কনফারেন্সের আগে ২৯শে জুন ভারতে ‘সোস্যাল বিজনেস ডে’ উপলক্ষে এ বিষয়ে আরেকটি কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। তাতে যোগ দেন বিভিন্ন দেশের ইউনূস সেন্টার ও সোস্যাল বিজনেস সেন্টারের প্রধান ও শীর্ষ কর্মকর্তারা। এবারের কনফারেন্স উপলক্ষে সামাজিক ব্যবসা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর গবেষণা প্রতিবেদন চাওয়া হয়। সোস্যাল বিজনেস অ্যাকাডেমিয়া কনফারেন্সের আয়োজকদের কাছে মোট ৫২টি প্রতিবেদন জমা পড়ে। এর থেকে ৩৭টি কনফারেন্সের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়।

সোস্যাল বিজনেস অ্যাকাডেমিয়া কনফারেন্স-২০১৮ এর আয়োজক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের ২৮টি দেশে মোট ৬৪টি ইউনূস সোস্যাল বিজনেস সেন্টার রয়েছে। এছাড়া, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আরো ৪৫টি ইউনিভার্সিটি ইউনূস সোস্যাল বিজনেস সেন্টার চালু করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

উৎসঃ   মানবজমিন
print

LEAVE A REPLY