বাস্তবায়নের সোয়া ২ লাখ কোটি টাকার সংস্থান নেই

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দ্রুতগতিতে উন্নয়ন প্রকল্প পাসের হিড়িক পড়েছিল। গত অক্টোবর থেকে নভেম্বরের প্রথম প্রান্তিকের মধ্যে প্রায় ৪০ দিনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন দেয়া হয়েছে ১৬৪টি প্রকল্প।

এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৩৮৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৬১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে দেয়া হবে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। বাস্তবে এসব প্রকল্পের বিপরীতে কোনো অর্থের সংস্থান রাখা হয়নি।

সরকারের রাজস্ব আয় কম হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা সরকারের কেন্দ্রীয় হিসাবে রয়েছে বড় ঘাটতি। এই ঘাটতি মেটাতে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে ২ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। প্রকল্প খাতে বৈদেশিক অনুদান ছাড়ের প্রবৃদ্ধির হার কমেছে ৩ গুণের বেশি।

সূত্র জানায়, আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বেশি অনুমোদন করা হয়েছে অবকাঠামো খাতের প্রকল্প। এর মধ্যে রয়েছে- নতুন সড়ক নির্মাণ, পুরনো সড়ক মেরামত, নতুন সেতু নির্মাণ, পুরনো সেতু মেরামত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও সংস্কার। এ ছাড়া সামাজিক ও কর্মসংস্থানমূলক বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে যেগুলো বাস্তবায়িত হলে জনপ্রত্যাশা পূরণ হবে। এর বেশিরভাগ প্রকল্পই সংসদ সদস্যদের সুপারিশের ভিত্তিতে একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সর্বশেষ একনেক বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে যুগান্তরের এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে অর্থায়নে কোনো সমস্যা হবে না। কেননা সব টাকা তো আর একসঙ্গে প্রয়োজন হচ্ছে না। তাছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহ দিতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে। অন্যদিকে সরকারের ঋণ নেয়ার পরিমাণ এখন অনেক কম। অর্থাৎ জিডিপির তুলনায় অনেক কম। সেইসঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করছি। সবকিছু মিলিয়ে টাকার সমস্যা হবে না।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, প্রকল্প অনুমোদন করার আগে এর একটি সমীক্ষা করা হয়। অর্থের সংস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়। সম্প্রতি পাস হওয়া এসব প্রকল্পের সমীক্ষা হয়েছে কিনা তা দেখার বিষয়। তবে যত দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে তত দ্রুত এসব প্রকল্পের ওইসব দিক সমীক্ষা করার মতো সক্ষমতা সরকারের আছে বলে আমি মনে করি না।

অপর একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, যদি সমীক্ষা ও অর্থের সংস্থান না করে প্রকল্প অনুমোদন করা হয়ে থাকে তবে বলতেই হবে এগুলো নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের খুশি করতে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাস্তবে এসব প্রকল্প কবে কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

অন্যদিকে ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনের শেষদিনে সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, দেশে রাজনৈতিক বাণিজ্য চক্র আছে। যেমন গত কয়েক সপ্তাহে তড়িঘড়ি করে অসংখ্য প্রকল্প পাস হয়েছে। এগুলোর অর্থায়ন কোথা থেকে কীভাবে হবে সেটি চিন্তা করা হয়নি। অনেকের নানা চাওয়া-পাওয়ার দিকে দেখে এটি করা হয়েছে। পরবর্তী সরকারকে প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন নিয়ে চিন্তা করতে হবে।

একনেকে কোনো প্রকল্প অনুমোদন হলে অর্থছাড় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ ২ মাস সময় লাগে। এর বাইরে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ১ থেকে দেড় মাসের মধ্যেও অর্থছাড় করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে সরকারের কোষাগারে এখন যথেষ্ট অর্থ নেই। প্রকল্পের অর্থ জোগান দেয়ার বড় উৎস রাজস্ব আয়, বৈদেশিক অনুদান ও ঋণ। তিন খাতেই নেতিবাচক অবস্থা চলছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আয় বেড়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল ২৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র দেড় শতাংশ। আগের অর্থবছরে একই সময়ে বেড়েছিল ২৮ শতাংশ। প্রকল্প খাতে বৈদেশিক অনুদান গত অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে বেড়েছিল ৬৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার ২ গুণেরও কম।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত নেয়া হয়েছে ২ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের কারণে সরকার এ খাত থেকে চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান পাচ্ছে না। সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও কমে যাবে। এ কারণে ঋণের জন্য চাপাচাপিও করছে না। ফলে যে ঋণ পাচ্ছে সেগুলো রাজস্ব খাতেই বেশি ব্যয় হচ্ছে। উন্নয়ন খাতে টাকার জোগান দিতে পারছে না।

সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ১ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪০ দিনেই একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে সোয়া ২ লাখ কোটি টাকার প্রকল্প। যা এডিপির চেয়েও ৪০ হাজার ৫১৫ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ১৬ হাজার ৩০৯ কোটি ৩ লাখ টাকা জোগান দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থায়ন নিয়ে।

এদিকে কোনো অর্থবছরই উন্নয়ন প্রকল্প পুরো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বরং গত ৯ বছর ধরে উন্নয়ন বাজেটের আকার বাড়লেও বাস্তবায়নের হার কমেছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ২ অক্টোবর একনেক বৈঠকে অনুমোদন দেয়া হয় ১৫টি উন্নয়ন প্রকল্প। এগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ২১৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ৯ অক্টোবর একনেকে অনুমোদন পায় ২০ প্রকল্প। এগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৩২ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। ১১ অক্টোবর অনুমোদন দেয়া হয় ১৭ প্রকল্প। এর জন্য ব্যয় হবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ২৩ অক্টোবর ১৯ হাজার ৭৭৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে অনুমোদন দেয়া হয় ২১ প্রকল্প। ৩০ অক্টোবর ২৪টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে একনেক। এগুলোর জন্য ব্যয় ধরা হয় ২৪ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা।

৪ নভেম্বর অনুমোদন পেয়েছে রেকর্ডসংখ্যক ৩৯টি প্রকল্প। এগুলোতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার ৬৮৬ কোটি ৯৫ হাজার টাকা। সর্বশেষ ৭ নভেম্বর বিশেষ একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে ২৮ উন্নয়ন প্রকল্প। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৩০ হাজার ২৩৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

jugantor

print

LEAVE A REPLY