ফ্যাসিবাদ যে ভাবে কাজ করে

উম্মে সালমা

জ্যাসন স্ট্যানলি ও How fascism works গ্রন্থের প্রচ্ছদ

ফ্যাসিবাদ সব সময় প্রকাশ্যে তার কাজ কর্ম চালায় না। ফ্যাসিবাদের অন্যতম কাজ হলো সত্যকে হত্যা করা। সত্যের এই অবক্ষয় ছাড়া ফ্যাসিবাদ কোন ভাবেই ফাংশন করতে পারে। ফ্যাসিবাদ বিষয়ক কাজের জন্য তাত্ত্বিক দুনিয়ায় যারা খুব আলোচিত তাদের মধ্যে অন্যমত একজন হলেন জ্যাসন স্ট্যানলি। তিনি নিজেও পরিবারিক ভাবে ফ্যাসিবাদের অভিজ্ঞতার সাথে পরিচিত। সেই হিটলারের আমলের নিষ্ঠুরতার ইতিহাসের সাথে তিনি সরাসরি পারিবারিকভাবেই অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। এখন আছেন আমেরিকায়। দেখছেন ট্রাম্পের বাণিজ্যিক ও যৌনউদ্দীপক ফ্যাসিবাদ। সব মিলে তার কাজের গুরুত্ব সত্যিই অসাধারণ। সিয়ান ইলিং লেখকের সাথে তার আলোচিত বই (How Fascism Works: The Politics of Us and Them) সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮ তে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই এই আলোচনায় বসেন। এই প্রথম বাংলাতে তার সাক্ষাৎকার অনুবাদ করা হয়েছে জবানের পাঠকদের জন্য। অনুবাদ করেছেন, উম্মে সালমা।

‘ফ্যাসিবাদ’ বর্তমান সময়ে বহুল প্রচলিত একটি শব্দ যা সাধারণত অন্যের রাজনীতিকে অসম্মানিত করতেই ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে প্রকৃতপক্ষে কেউই এই টার্ম সম্পর্কে কিছুই জানে না। উদারপন্থীরা ফ্যাসিবাদকে মূল্যায়ন করে রক্ষণশীল চিন্তাভাবনা হিসেবে। যেমন স্বৈরাচারী, জাতীয়তাবাদী এবং ফ্যাসিবাদী সরকারের বর্ণবাদী সিস্টেমের সর্বোচ্চ পরিণতি হিসেবে দেখে থাকেন। আবার, রক্ষণশীলদের চোখে, ফ্যাসিবাদ হলো সার্বভৌম চিন্তাভাবনার ছদ্মবেশে একটি পোষ্য-রাষ্ট্র ব্যবস্থা।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান শিক্ষক, দার্শনিক জ্যাসন স্ট্যানলি তার নতুন বইয়ে ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা এবং আধুনিক বিশ্বে ফ্যাসিবাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পাঠকের কাছে পরিষ্কার ভাবে তুলে ধরার সর্বশেষ প্রয়াস চালিয়েছেন। স্ট্যানলি মূলত প্রোপাগান্ডা বা প্রজ্ঞাপন এবং রেটোরিক বা আড়ম্বরপূর্ণ ভাষার উপর ফোকাস করেছেন। আর তাই তার বইকে মূলত ফ্যাসিস্ট রাজনীতিকে ঘিরে একটি বক্রোক্তিমূলক আখ্যান বলা যায়।

আমি বর্তমানের ফ্যাসিবাদের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে তার (স্ট্যানলি) সাথে আলোচনা করেছিলাম। কেন ফ্যাসিস্ট আন্দোলনে সত্যের অবক্ষয়ের এত প্রয়োজন, এবং কেনই বা তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফ্যাসিবাদী বলে সম্বোধন করাটা যুক্তিসঙ্গত মনে করেন, এ রকম অনেক কিছু নিয়েই তার সাথে আলাপ হয়েছিল। আমাদের সংলাপের কিয়দংশ করে এখানে তুলে ধরা হলো :

আমি ফ্যাসিস্ট লোকদের কোনো কিছুর উপর বিশ্বাস আছে বলে মনে করি না। তারা ক্ষমতা অর্জন এবং ধরে রাখার জন্য একটি নির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করে।

সিয়ান ইলিং : প্রায় প্রত্যেকেই ‘ফ্যাসিবাদ’ এই শব্দটির ব্যবহার সম্পর্কে ভিন্ন কিছু অভিমত দিয়ে থাকে। আপনি কি মনে করেন

জ্যাসন স্ট্যানলি : আমি মনে করি ফ্যাসিবাদ রাজনীতির একটি প্রক্রিয়া। এটি ক্ষমতা লাভের জন্য চলমান একটি আলংকারিক বা আড়ম্বরপূর্ণ পদ্ধতি। অবশ্যই এটি ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের সাথে সম্পর্কযুক্ত। কেননা এই ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শ গড়ে ওঠে ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে। তবে আমি ফ্যাসিবাদকে দেখি ক্ষমতা অর্জনের একটি টেকনিক বা কৌশল হিসেবেই। লোকজন সর্বদা জিজ্ঞাসা করে, “এ ধরনের রাজনীতিবিদ কি সত্যিই ফ্যাসিবাদী?” এই প্রশ্নটি আসলে আরেকটি উপায়ে জিজ্ঞাসা করা হয় যে এই ব্যক্তির কি কোনো নির্দিষ্ট বিশ্বাস বা মতাদর্শ আছে কি না। তবে, আমি ফ্যাসিস্ট লোকদের কোনো কিছুর উপর বিশ্বাস আছে বলে মনে করি না। তারা ক্ষমতা অর্জন এবং ধরে রাখার জন্য একটি নির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করে।

ফ্যাসিবাদ কি তাহলে একটি স্বতন্ত্র শ্রেণি নয়—তবে কি একটি স্পেকট্রাম বা বর্ণচ্ছটা মাত্র? অথবা এটি একটি স্লাইডিং স্কেল?

ঠিক। আমার এই বইটি (How fascism works) ফ্যাসিস্টরা যে সকল কৌশল গ্রহণ করে সেগুলোকে চিহ্নিত করেছে এবং তাদের রাজনীতিতে তারা কিভাবে আরো কম বা বেশি ফ্যাসিবাদী হতে পারে সেটাও তুলে ধরেছে পাঠকের সামনে। মূল বিষয় হলো ফ্যাসিস্ট রাজনীতির আসল কাজ হচ্ছে শত্রুদের শনাক্ত করা, গোষ্ঠীতে (সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী) নিজের অবস্থান শক্ত করা, এবং সত্য ধ্বংস করা এবং ক্ষমতার প্রতিস্থাপন করা।

কমিউনিজমের চরম রূপ মৌলবাদের দোহাই দিয়ে স্বাধীনতাকে দমন করে,ঠিক তেমনি ডানপন্থী রাজনীতির চরম রূপ ফ্যাসিবাদের নামে ঐতিহ্য, কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতার আদলে স্বাধীনতাকে দমন করে।

আমরা এই কৌশলগুলো সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানব। তবে আমি ভীষণভাবে জানতে আগ্রহী কেন আপনার কাছে মনে হয় ফ্যাসিবাদকে একটি ভাবাদর্শ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা কঠিন। বামপন্থী লোকেরা ফ্যাসিবাদকে ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাধারার শেষ বিন্দু হিসেবে দেখেন এবং ডানপন্থী লোকেরা ফ্যাসিবাদকে সার্বভৌম ন্যানী–রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করেন। স্পষ্টতই এটা তো একই সাথে উভয়ই হতে পারে না।

একে সুস্পষ্টভাবে আমার কাছে ডানপন্থী মনে হয়। এই সমস্যার একটি অংশ হলো ‘ডান’ এবং ‘বাম’ নিয়ে কৌশলে কথা বলতে হয়। এবং এটি সত্য যে উভয় পক্ষেরই চরমপন্থার বিপজ্জনক রূপ আছে, কিন্তু আমার দৃষ্টিতে ফ্যাসিবাদ ডানপন্থীদের দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকে। যদি আপনি ফ্যাসিবাদকে স্লাইডিং স্কেল মনে করেন, তাহলে রক্ষণশীল রাজনীতি নিজেকেই এই স্কেলে খুঁজতে থাকবে -যাকে পুরোপুরি ফ্যাসিবাদ বলা যাবে না। আবার সাধারণ ডেমোক্রেটিক রাজনীতির চেয়েও কম কমিউনিস্ট বলা যাবে না। কিন্তু কমিউনিজমের চরম রূপ মৌলবাদের দোহাই দিয়ে স্বাধীনতাকে দমন করে,ঠিক তেমনি ডানপন্থী রাজনীতির চরম রূপ ফ্যাসিবাদের নামে ঐতিহ্য, কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতার আদলে স্বাধীনতাকে দমন করে।

আপনার বইয়ের বিশেষত্ব হলো ফ্যাসিবাদের প্রচারণা এবং আলংকারিক বা জটিল শব্দের ব্যবহার নিয়ে আপনি কথা বলেছেন। এবং এই বইয়ে আপনি ফ্যাসিবাদকে কঠিন কঠিন উক্তি দ্বারা এবং গল্পের মতো বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, ফ্যাসিবাদের এই গল্পটি কি নিয়ে আবর্তিত?

অতীতে, ফ্যাসিস্ট রাজনীতি প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক দলের উপর মনোযোগ দিতো। লক্ষ্য ছিল এদেরকে নিঃস্ব করে দেয়া এবং এদের ভিতর একটা দ্বন্দ্ব তৈরি করা যাতে তারা নিজেদের ভুক্তভোগী মনে করে। এবং এরা ছিল সাধারণত সংখ্যালঘু অথবা বিরোধী জাতি।

এ কারনেই বিশাল উদ্বেগের মুহূর্তেই ফ্যাসিবাদ ফুলে ফেঁপে ওঠে। কেননা আপনি এই উদ্বেগের সাথে মিথ্যা মিথ্যা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ভয়ের সংযুক্তি ঘটাতে পারেন। গল্পটি সাধারণত একটি বড় সমাজকে ঘিরে, যেই সমাজের উদারতা বা নারীবাদ বা সাংস্কৃতিক মার্ক্সবাদ অথবা যাই হোক না কেন ধ্বংস হয়ে গেছে। এবং আপনি লক্ষ্য করবেন এই প্রভাবশালী গোষ্ঠী তাদের পদমর্যাদা এবং ক্ষমতার বিনাশের কারনে ক্রুদ্ধ এবং বিরক্ত। প্রায়শই ফ্যাসিবাদের প্রতিটি আবির্ভাব এই সাধারণ বর্ণনামূলক কাহিনীর মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। আমরা কিছু সংখ্যাক ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্বের কারণে ভীত নই। তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ঠ কারণ আছে, এবং আমাদের সতর্ক থাকতে হবে -এটি ইতিহাসের পাঠ।

কেন ফ্যাসিবাদ প্রকল্পটি এত সমালোচনামূলক? এবং এই আদর্শর জন্য কেন সত্যের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে?

এটি গুরুত্বপূর্ণ কেননা সত্যই হলো উদার (Liberal) গণতন্ত্রের হার্ট বা কেন্দ্রবিন্দু। উদার গণতন্ত্রের দুটি মূল বিষয় হলো স্বাধীনতা এবং সমতা। যদি আপনার বিশ্বাস এবং জীবনযাপন মিথ্যা দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে আপনি স্বাধীন নন। কেউই উত্তর কোরিয়ার নাগরিকদের স্বাধীন মনে করে না, কেননা তাদের কার্যাবলি মিথ্যা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য সত্যের প্রয়োজন। স্বাধীনতার জন্য দরকার জ্ঞানের। এবং এই পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হলে, আপনাকে প্রথমে জানতে হবে এই দুনিয়া সম্পর্কে এবং নিজের কাজ সম্পর্কে। আপনাকে শুধু জানতে হবে আপনি যা করছেন সেখানে সত্যের প্রবেশাধিকার আছে কি না। তাই স্বাধীনতার প্রয়োজন সত্যের, এবং স্বাধীনতাকে ধ্বংস করতে হলে আপনাকে অবশ্যই সত্যকে ধ্বংস করতে হবে।

ফ্যাসিস্টরা কেবল মিথ্যা বলেই সন্তুষ্ট থাকে না; তারা অবশ্যই তাদের মিথ্যাকে একটি নতুন বাস্তবতার মোড়কে রূপ দেয়। এবং তারা জনগণকে অবাস্তবতা বিশ্বাস করতে বাধ্য করে।

দার্শনিক হান্নাহ আরেন্দ এর বইয়ে ‘টোটালিটারিয়ানিজম’ বা সর্বময় কর্তৃত্ববাদী সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি বিখ্যাত লাইন আছে, যেখানে তিনি বলেন, ফ্যাসিস্টরা কেবল মিথ্যা বলেই সন্তুষ্ট থাকে না; তারা অবশ্যই তাদের মিথ্যাকে একটি নতুন বাস্তবতার মোড়কে রূপ দেয়। এবং তারা জনগণকে অবাস্তবতা বিশ্বাস করতে বাধ্য করে। এবং আপনি যদি এসব বিশ্বাস করার মতো লোকজন পান, তাহলে আপনি তাদেরকে দিয়ে যে কোন কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারবেন।

আমি এটিকে সঠিক বলেই মনে করি। ফ্যাসিবাদী রাজনীতির একটি অংশই হলো লোকজনকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা। আপনি দেখবেন যে এরা বাস্তবতার আদলে কল্পনার জগতেই বিচরণ করে। জাতীয়তাবাদী রচনায় সাধারণত একটি দেশের পতন সম্পর্কে আলোচনা করা হয় এবং একজন শক্তিমান নেতার প্রয়োজনের কথা উল্লেখ থাকে যিনি জনগণকে মহত কর্মকাণ্ডের দিকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন। এবং যখন এরা বিশ্বের কোথাও নিজেদের আশ্রয় খুঁজে পাবে না -তাদের নেতাই হবে তখন একমাত্র ভরসাস্থল।

আংশিকভাবে আমি ফ্যাসিবাদকে এক ধরণের রাজনীতি মনে করি Joseph Goebbels এর একটি উদ্ধৃতি মনে পড়ল তিনি ছিলেন নাৎসিদের প্রধান প্রচারক এবং তিনি বলেন যে তিনি যা করেছেন তা রাজনীতি থেকে শৈল্পিক পর্যায়ের কাজ। যার দ্বারা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন তাদের কাজ ছিল জার্মানিদের জন্য বিকল্প পৌরাণিক বা মিথিক্যাল বাস্তবতা সৃষ্টি করা। এবং এটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির নীরস বাস্তবতা থেকে বেশি উত্তেজনাপূর্ণ এবং উদ্দেশ্যমূলক ছিল। এবং এই কারনেই নাজিদের উথানে গণমাধ্যমের প্রয়োজন অনস্বীকার্য।

ব্যাপারটি আসলেই ইন্টারেস্টিং। প্রকৃতপক্ষে, লোকজন ইচ্ছাকৃতই পৌরাণিক অতীতে মগ্ন থাকতে পছন্দ করে। ফ্যাসিবাদীরা হারিয়ে যাওয়া গৌরবোজ্জ্বল অতীত নিয়ে গল্প করে সবসময়, এবং তারা এরকম নস্টালজিয়ায় ভোগে। আর তাই যখন আপনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন, তখন আপনার এক হাত পেছনে বাধা থাকবে। কারণ সত্যটি নোংরা এবং জটিল ভাবে আড়ালে থাকে। আবার পৌরাণিক গল্প সর্বদা স্পষ্ট এবং আকর্ষণীয় এবং বিনোদনের। তবে এটাকে আসল ঘটনা থেকে আলাদা করা সত্যিই অনেক কঠিন।

ফ্যাসিবাদীরা হারিয়ে যাওয়া গৌরবোজ্জ্বল অতীত নিয়ে গল্প করে সবসময়, এবং তারা এরকম নস্টালজিয়ায় ভোগে। আর তাই যখন আপনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন, তখন আপনার এক হাত পেছনে বাধা থাকবে। কারণ সত্যটি নোংরা এবং জটিল ভাবে আড়ালে থাকে।

এখন সম্ভবত দামি ঝকঝকে হাতির মতো মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভালো সময় অতিবাহিত হচ্ছে। তিনি কি ফ্যাসিবাদী?

আমি আমার বইয়ে উল্লেখ করেছিলাম তিনি ফ্যাসিস্ট রাজনীতি চর্চা করেন। এখন, তার মানে এই না যে তার সরকার ফ্যাসিবাদী সরকার। আসলে, আমি মনে করি ফ্যাসিস্ট সরকার কি এটা ব্যাখ্যা করা অনেক কঠিন একটি ব্যাপার। আরেকটি বিষয় হলো, আমার ধারণা এসকল কৌশল ব্যবহারকারী বর্তমান আন্দোলনের নেতাবৃন্দ (রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন, তুর্কির রিসেপ তাইপ এরদোগান, হাংগেরির ভিক্টর উরবান —এরকম আরো অনেকে) রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেন। তবে তাদের লক্ষ্য হলো পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে নিজস্ব ব্যক্তিত্বের খাপ খাওয়ানো।

আবার, আমি অন্তত এটাও দাবি করব না- ট্রাম্প ফ্যাসিবাদী সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে তিনি উদার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্মূল করতে এবং তার ভিত্তিকে মজবুত করার বদলে এগুলোকে অকেজো করার জন্য পরিষ্কারভাবে ফ্যাসিবাদী কৌশলগুলো ব্যবহার করছেন। এই ব্যাপারটি খুবই সমস্যাগ্রস্ত। তবে রিপাবলিকান পার্টির উপর যতটা দায় চাপানো যায় ঠিক ততটাই যায় ট্রাম্পের উপর। কেননা তারা যদি ট্রাম্পকে বাধা দিতে ইচ্ছুক হতো এসব কোনো ব্যাপারই ছিল না। তারা আইনের অনুশাসনের আনুগত্যের তুলনায় ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্যকেই বেছে নিয়েছে। ফ্যাসিস্ট রাজনীতির একটি কৌশলের অংশই হলো জনগণকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

এই বইয়ে, আপনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আমেরিকার রাজনীতিতে মজ্জাগতভাবেই ফ্যাসিবাদ আছে, অথবা কমপক্ষে আমেরিকায় ফ্যাসিবাদ হলো গোপন শক্তি। আপনি এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারবেন?

আচ্ছা। কু কক্স ক্ল্যান গভীরভাবে এডলফ হিটলারকে প্রভাবিত করেছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে ১৯২৪ সালের ইমিগ্রেশন অ্যাক্টের প্রশংসা করেন, যা একটি কার্যকর মডেল হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতিপ্রাপ্ত অভিবাসীদের সংখ্যা সীমাবদ্ধ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯২০ এবং ১৯৩০ সালের সময়টা ছিল ফ্যাসিবাদের। আপনি কালো আমেরিকান এবং অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোকে তাদের পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক অসন্তোষের কারণে এদেরকে অভ্যন্তরীণ হুমকি মনে করবেন। সুতরাং আমাদের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা এবং কালো-বর্ণবাদ বিরোধী এবং অভিবাসন বিরোধীদের প্রতি হিংস্রতার এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে। একই সাথে আমেরিকায় ভিন্নমতাবাদ চর্চার যে তীব্রতা দেখা যায় যা পৌরাণিক ইতিহাসকে সামনে আনে এবং আমেরিকানদের অনুপ্রাণিত করে নিজের দেশকে চিরতরে স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে ভাবতে।

এটি আমেরিকাকে ফ্যাসিস্ট দেশে পরিণত করেনি। তবে এই সকল উপাদান সহজেই ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা প্রকাশ করে।

এবং ঠিক একই সময় ভারসাম্যরক্ষাকারী শক্তিসমূহ একটি জাতিকে বিপরীত অভিমুখে ঠেলে দেয়। আর এই কারণেই আমেরিকায় উদার গণতন্ত্র এবং প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিবাদের মধ্যে চিরস্থায়ী উত্তেজনা বিদ্যমান।

একেবারেই সঠিক। আমেরিকা সবসময় উত্তম পন্থায় ব্যতিক্রমী কাজ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাগরিক অধিকারের জন্য আমাদের সংগ্রাম এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধকে স্বাধীনতা এবং সমতার পক্ষে একটি ব্যতিক্রমী আত্মোৎসর্গ বলা যায়। এ সকল ব্যাপারে আমার অবস্থান খুবই দৃঢ়। এবং আমি বিশ্বাস করি আমেরিকার সত্যিই ভালো কিছু মুহূর্ত ছিল এবং অনেক উন্নতি সাধন করেছে। কিন্তু যেমন আপনি বলেছেন, ফ্যাসিস্ট হুমকি সর্বদা লুকিয়ে থাকে, এবং আমাদের কেবল এটি সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার।

সামনের দিকে এগিয়ে চলার জন্য আপনার বইয়ে কি কোনো বার্তা আছে? যদি আমরা দেশে এবং বিদেশে ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের সম্মুখীন হই, নাগরিক এবং সরকারের তখন কি করণীয়?

আমেরিকার হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের পাশে কবিতাটির বিষয়বস্তুর দিকে সতর্কতার সাথে মনোযোগ দেওয়া উচিত। যেখানে বলা আছে, “প্রথম তারা যখন এসেছিল সমাজতন্ত্রের জন্য, আমি কোনো কথা বলিনি কেননা আমি সমাজতন্ত্রী ছিলাম না। তারপর যখন তারা এসেছিল ট্রেড ইউনিয়নের পক্ষ নিয়ে, আমি কোনো কথা বলিনি কেননা আমি ট্রেড ইউনিয়নের ছিলাম না। তারপর তারা যখন ইহুদিদের জন্য আসল আমি মুখ খুলিনি কারণ আমিতো আর ইহুদি ছিলাম না। তারপর যখন তারা আমার জন্য এসেছিল এবং কেউই অবশিষ্ট ছিল না আমার পক্ষ নিয়ে কথা বলার জন্য।” একটা নির্দিষ্ট সময় আসে তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। আমরা এই কবিতা থেকে জানলাম কাদের টার্গেট করা হয়। এই টার্গেট করা লোকজন হলো বামপন্থী সংখ্যালঘু, শ্রমিক সংঘ এবং যেকোনো প্রতিষ্ঠান, যাদেরকে ফ্যাসিবাদী গল্পে মহিমান্বিত করা হয় না। এবং যদি আপনি ঐ সমস্ত গোষ্ঠীর কেউ না হন, তারপরেও আপনাকে এদের রক্ষা করতে হবে এবং শুরু থেকেই তাদের সুরক্ষা দিতে হবে। সাধারণ কাজে সাহসিক কর্মকাণ্ড আপনাকে পরবর্তীতে অসম্ভব কঠিন কাজে সাহস প্রদর্শন করার পথ সুগম বা সহজ করবে। একটা জিনিস সুস্পষ্ট, এটি খুব বিপজ্জনক নয়। আমরা ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্বের কারণে সংকুচিত নই। কিন্তু উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ঠ কারণ আছে, এবং আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে —এটি ইতিহাসের পাঠ। স্বাধীনতা এবং সমতার উঁচু মাপের আদর্শই হলো আমাদের অস্ত্র এবং এই সকল আদর্শকে টিকিয়ে রাখতে আমাদের সংগ্রাম করতে হবে। আমরা অনেক ভাগ্যবান এই ক্ষেত্রে যে আমাদের প্রতিষ্ঠাতার আদর্শের মাঝেই স্বাধীনতা এবং সমতা ছিল। আমাদের এই আদর্শগুলোর প্রতি আকৃষ্ট লোকজনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে এবং তারা বলে, “অনেক বিষয় নিয়ে আমাদের ভিতর মতানৈক্য থাকতে পারে কিন্তু সত্য, স্বাধীনতা, সমতা এই বিষয়গুলোর প্রতি আমরা একমত প্রকাশ করি”। সুতরাং যাই ঘটুক না কেন, এই সকল আদর্শের প্রতি আমাদের সংখ্যা দ্বিগুণ পরিমাণে বাড়াতে হবে -যা আমাদের রক্ষা করবে।

উৎসঃ   জবান
print

LEAVE A REPLY