ভারতীয় পত্রিকার ‘আজগুবি’ প্রতিবেদন

“হাসিনাকে সরাতে ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ করবে বেজিং” শিরোনামে আসামভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যমের (দৈনিক যুগশঙ্খ) একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে বেশ ছড়িয়েছে। ৩০ নভেম্বরের (গতকাল শুক্রবার) এই প্রতিবেদনটিতে দেয়া ‘তথ্য’ যাচাই করতে bdfactcheck.com পাঠকদের বেশ কয়েকজন অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তার প্রেক্ষিতে প্রতিবদেনটি সম্পর্কে আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়াচ্ছে খবরটি–

#অজ্ঞাত সূত্রের বরাত:

প্রথমত, প্রতিবেদনটি যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন সেটিতে উল্লেখ করা কোনো সূত্রের সাথে যোগাযোগ করা। কিন্তু এই রিপোর্টে যোগাযোগ করার মতো কোনো সূত্র নেই। যেসব দাবি করা হয়েছে সেগুলোই সবই অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে। ভিন দেশের এত গুরুত্বপূর্ণ খবর পরিবেশনের সময় কোনো সূত্রের পরিচয় ব্যবহার না করা, বা অন্য কোনো প্রমাণ সরবরাহ না করে এমন দাবি করা সাংবাদিকতার নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।

এছাড়া bdfactcheck.com এর পক্ষ থেকে দৈনিক যুগশঙ্খের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাদের ওয়েবসাইটে কোনো ফোন নম্বর পাওয়া যায়নি। তবে একটি ইমেইল আইডি পেয়ে সেটিতে ইমেইল করা হলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

#অস্বাভাবিক তথ্য:

আলোচ্য রিপোর্টটিতে যেসব দাবি করা হয়েছে তার প্রধানটি হচ্ছে, হাসিনাকে সরাতে ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ করবে বেজিং। আর এই বিশাল খরচের বিনিময়ে চীন চায় বিরোধী জোট ঐক্যফ্রন্টকে ক্ষমতায় বসাবে।

বিশ্বের কোনো দেশে কোনো সরকারকে সরিয়ে পছন্দের সরকার বসাতে বড় কোনো দেশের ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ করার ঘটনা নজিরবিহীন। ভিন দেশের সরকার পরিবর্তনে সবচেয়ে সিদ্ধহস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসেও কোনো একটি সরকারকে সরাতে এত বিশাল পরিমাণ খরচ করার কোনো দাবি কখনো শোনা যায়নি। চীনের বিরুদ্ধেও ছোট ছোট বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার অভিযোগ থাকলেও এত বড় পরিমাণ অর্থ ব্যয় দেশটির জন্য অস্বাভাবিক।

কোনো নির্বাচনের আগে পছন্দের পক্ষের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ করা বড় পরিমাণের অর্থব্যয় তা বুঝতে একটি উদাহরণ দেয়া যায়। শ্রীলংকা চীনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। ২০১৫ সালে দেশটির জাতীয় নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থী (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) মাহিন্দ রাজাপাকসেকে বিজয়ী দেখতে চেয়েছিল। সেজন্য রাজপাকসের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে সাড়ে ৭ মিলিয়ন ডলার (৬৩ কোটি টাকা প্রায়) গোপনে দিয়েছিল চীন। পরে নিউইয়র্ক টাইমস এক অনুসন্ধানে তা প্রকাশ করেছিল।

লক্ষ্যণীয় হল, ১ বিলিয়ন ডলার হয় ১ হাজার মিলিয়ন ডলারে। সে হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে গোপনে (১০×১০০০) ১০ হাজার মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় ৮৪ হাজার কোটি টাকার মতো) দিয়েছে চীন!

#চরমভাবে স্ববিরোধী তথ্য:

সবচেয়ে বড় কথা হল, আলোচ্য রিপোর্টটি চরমভাবে স্ববিরোধী। রিপোর্টটি শেষাংশে লেখা হয়েছে–

“পরিসংখ্যান বলছে, চীন বাংলাদেশে রপ্তানি করে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। সবমিলিয়ে বাংলাদেশকে তারা বছরে একশো কোটি ডলারের অর্থসাহায্য দেয়। তবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২৪ বিলিয়ন বা দুই হাজার চারশো কোটি ডলারের সাহায্য দেওয়ার কথা ঘোষনা করেন। বাংলাদেশের পরিকাঠামোগত প্রকল্পে ৩১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে চীন। যা পাকিস্তানের পরই দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। এর মধ্যে রয়েছে, সড়ক, রেল,কয়লা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পানি পরিশোধনগার নির্মাণ। বাংলাদেশে বর্তমানে চীনা বিনিয়োগ সরকারি এবং বেসরকারি খাতে মোট ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া কৌশলগত অংশীদার হিসাবে চীনের শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের যৌথ কনসর্টিয়ামের কাছে বাংলাদেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।”

অর্থাৎ, উপরের এই পরিসংখ্যান বলছে বিগত এক দশকে (বর্তমান সরকারের আমলে) চীন বাংলাদেশে ইতিহাসের সবেচেয়ে বড় বিনিয়োগের চুক্তি করেছে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে চীন তার চাহিদা মতো প্রকল্পের কাজ বাংলাদেশে না পেলেও যেগুলো বর্তমান সরকারের আমলে পেয়েছে তা বিগত যে কোনো সরকারের চেয়ে বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিগত বছরগুলোতে চীনের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য বেড়েছে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গতিতে।

অথচ, রিপোর্টটির প্রথমে বলা হয়েছে—

“শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করবে চীন। উদ্দেশ্য একটাই, বাংলাদেশের আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী জোট ঐক্যফ্রন্টকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা। যার চালিকা শক্তি হল খালেদার দল বিএনপি। শুধু তাই নয়, তাদের সঙ্গে রয়েছে মৌলবাদী দল জামায়াতে ইসলামী। বিএনপি ও জামায়াতের মূল বৈশিষ্ট্য এরা উভয়ই পাকিস্তান ও চিনপন্থী। অতএব নিজেদের স্বার্থেই চীন বাংলাদেশের এই বিরোধী ঐক্যফ্রন্টকে ক্ষমতায় ফেরাতে আদাজল খেয়ে নেমেছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ঢাকার প্রশাসন সূত্রে খবর, দীর্ঘ দশ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনাকে যেনতেন প্রকারে গতিচ্যুত করে খালেদার জোটকে মসনদে বসাতে তৎপর চীন। আর এ জন্যই তারা এ অর্থব্যয়ে প্রস্তুত। প্রশ্ন উঠেছে, কেন হাসিনা সরকারের প্রতি এমন বিরাগভাজন হল চীন? দেখা গিয়েছে, সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বড় বড় প্রকল্প থেকে চীনকে বাদ দেয় হাসিনা সরকার। যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বঙ্গোপসাগরে একটি প্রকল্প। হাসিনা সরকারের উপর বেইজিংয়ের আক্রোশের পেছনে এটিই বড় কারণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। যার ফলে হাসিনা সরকাকে কুর্সিচ্যুত করতে চীনের ১০ বিলিয়ন অর্থব্যয়।”

বলা হচ্ছে, “সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বড় বড় প্রকল্প থেকে চীনকে বাদ দেয় হাসিনা সরকার।” যদি বড় বড় প্রকল্প না পেয়ে থাকে তাহলে একই রিপোর্টের এই বক্তব্যটি সত্য হয় কিভাবে– “বাংলাদেশের পরিকাঠামোগত প্রকল্পে ৩১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে চীন। যা পাকিস্তানের পরই দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। এর মধ্যে রয়েছে, সড়ক, রেল,কয়লা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পানি পরিশোধনগার নির্মাণ। বাংলাদেশে বর্তমানে চীনা বিনিয়োগ সরকারি এবং বেসরকারি খাতে মোট ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।”

তাছাড়া প্রশ্ন উঠে, যদি বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমে থাকতো তাহলে এই সরকারের হাত ধরে এত এত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করিয়ে এই সরকারের হাতকে আরও শক্তিশালী করছে কেন?!

#পরিস্থিতির সাথে মিলে না:

কোনো সরকারের পতনের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে রাজি হওয়ার আগে সেই সরকারের সাথে যেমন দৃশ্যমান বিরোধ থাকা প্রয়োজন তার কিছুই নেই চীন ও বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মধ্যে। বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সরবতা ঢাকায় গত কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করা গেলেও চীনা রাষ্ট্রদূত বা অন্যান্য পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য কোনো সরবতা নেই। ২০১৬ এর পর উল্লেখ করার মতো কোনো চীনা নেতাও বাংলাদেশে সফর করেননি।

অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক জোটের সাথেও চীনের কোনো ধরনের বিশেষ যোগাযোগের খবরও সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায় না। ঐক্যফ্রন্টের কোনো নেতা বা প্রতিনিধিদল চীনে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। বরং গত মাসে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল চীনা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে সাক্ষাত করে এসেছেন।

সার্বিক বিবেচনায় যুগশঙ্খের প্রতিবেদনটিকে ‘আজগুবি খবর’ বলাই যায়।

উৎসঃ   বিডিফ্যাক্টচেক
print

LEAVE A REPLY