নামের মতোই অস্ত্র চালাতো বুলেট!

মেহেদী হাসান ওরফে সৈকত ওরফে জুয়েল মুন্সী ওরফে বুলেট। বয়স মাত্র ২৫ বছর। থাকতো তেজগাঁও রেলওয়ে বস্তিতে। ছিল ছিঁচকে চোর। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। সঙ্গে সবসময় অস্ত্র-গুলি থাকতো তার। এ কারণে তার নাম হয়ে যায় বুলেট। নামের মতো অস্ত্র চালাতে পারদর্শী ছিল সে। তেজগাঁও, কাওরানবাজার, মহাখালী, ধানমন্ডি এলাকায় ছিনতাইসহ নানারকম অপরাধ কর্মাকাণ্ড করে বেড়াতো। গড়ে তুলেছিল নিজের নামে ‘বুলেট বাহিনী’। দীর্ঘদিন ধরেই তাকে খুঁজছিল পুলিশ। শেষপর্যন্ত ফাঁদ পেতে রুবেল নামে এক সহযোগীসহ বুলেটকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পল্লবী জোনাল টিম। গত বৃহস্পতিবার (২৯ নভেম্বর) তেজগাঁও অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একটি রিভলভার, একটি শর্টগান ও দশ রাউন্ড শর্টগানের গুলি। তেজগাঁও থানায় দায়ের করা অস্ত্র মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে এই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

এই প্রসঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার শাহাদত হোসেন সুমা বলেন, ‘‘বুলেট তেজগাঁও-মহাখালী ও কারওয়ানবাজার এলাকায় ‘বুলেট বাহিনী’ গড়ে তুলে ছিনতাই চাঁদাবাজি করতো। সে তার নামের মতোই বুলেট চালাতো। তাকে আমরা অনেকদিন ধরেই গ্রেফতারের চেষ্টা করছিলাম। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। রুবেল নামে এক সহযোগীসহ তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার সহযোগী অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’’

ডিবি সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পল্লবী জোনাল টিমের সদস্যরা জানতে পারে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন পলিটেকনিক কলেজের পেছনে সেন্ট্রাল হাসপাতালের সামনে অস্ত্রধারী কয়েকজন সন্ত্রাসী মিলিত হয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তিন যুবকে দেখতে পান গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা। এ সময় তাদের একজনের হাতে একটি শপিং ব্যাগ ও আরেকজনের হাতে একটি সাদা প্লাস্টিকের বস্তা ছিল। গোয়েন্দা পুলিশ তাদের দিকে এগিয়ে গেলে তারা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। পুলিশ দৌড়ে তাদের আটক করে প্লাস্টিকের বস্তার ভেতর থেকে একটি শর্টগান এবং রুবেলের হাতে থাকা শপিং ব্যাগ থেকে একটি রিভলভার উদ্ধার করে।’

ডিবির কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে এই সন্ত্রাসীরা জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে থাকা আরেক ব্যক্তির নাম আমীর। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সে পালিয়ে গেছে। তারা তিনজন ওই এলাকায় অস্ত্র নিয়ে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে মিলিত হয়েছিল। মাঝে মধ্যেই তারা সন্ধ্যার পর আলো-আঁধারির মধ্যে রিকশা আরোহীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বর্বস্ব ছিনিয়ে নিতো বলেও জিজ্ঞাসাবাদের সময় জানিয়েছে।

মেহেদী হাসান ওরফে সৈকত ওরফে জুয়েল মুন্সী ওরফে বুলেটের কাছ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র

সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে বুলেট জানিয়েছে, গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার মকসুদপুর এলাকার গোপালপুর হলেও তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা তেজগাঁও রেলওয়ে বস্তিতে। ঘটনার সময় সে তেজগাঁও রেলওয়ে কলোনির (এল-টাইপ) একটি বাসায় থাকতো। প্রথম দিকে ছিঁচকে চোর হিসেবে এলাকায় তার কুখ্যাতি ছিল। ধীরে ধীরে সে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হয়ে ওঠে। নিয়মিত ছিনতাই করে বেড়াতো। নিজেই গড়ে তুলেছিল বুলেট বাহিনী। তার দলে ১০-১২ জন তরুণ রয়েছে। ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের পাশাপাশি সে অস্ত্র বেচাকোনাতেও জড়িয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পালিয়ে যাওয়া আমীরের কাছ থেকে সে অস্ত্র সংগ্রহ করতো। এসব অস্ত্র সে আবার অন্যান্য এলাকার সন্ত্রাসীদের কাছে বিক্রিও করতো। অস্ত্র ও গুলি পকেটে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতেই তার নাম মেহেদী হাসান সৈকত থেকে বুলেট হয়ে যায়। ওই সূত্রের দাবি, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকার বিদ্রোহী প্রার্থীর ক্যাডাররা অস্ত্র সংগ্রহ করছে। এই সুযোগে বুলেট আরও কয়েকটি অস্ত্র কিনে এনে রাজনৈতিক ক্যাডারদের কাছে বিক্রি করবার পরিকল্পনাও করেছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, বুলেটকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার অস্ত্র চোরাচালানের নেটওয়ার্ক সম্পর্কেও জানার চেষ্টা চলছে। সে আগ্নেয়াস্ত্রগুলো কাদের কাছ থেকে কিনতো এবং কাদের কাছে বিক্রি করতো তাদের বিষয়েও খোঁজ-খবর করা হচ্ছে। ওই কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ততই অস্ত্র চোরাচালানের সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বেড়ে গেছে।

উৎসঃ   বাংলা ট্রিবিউন
print

LEAVE A REPLY