সরকারের ছকে নির্বাচন কমিশন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, নির্বাচন কমিশনের আসল রূপ ততটাই যেন বেরিয়ে পড়ছে। নির্বাচনের আগেই সম্ভবত ক্ষমতাসীন দলের ‘বিজয়’ নিশ্চিত করতে চায় কমিশন। এর একটি মহড়া হয়ে গেল মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের মধ্য দিয়ে। এবার বিরোধী রাজনৈতিক দলের একাধিক প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেননি। কিন্তু ইতোমধ্যে ছয়টি আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থীরই মনোনয়নপত্র টেকেনি। এ ছাড়া, সব মিলিয়ে ৮১ আসনে বিএনপির প্রার্থী বাদ গেছেন। রিটার্নিং অফিসারদের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করার সুযোগ আছে, কিন্তু নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত বিরোধী দলের সাথে যে ধরনের আচরণ করেছে, তাতে কতজন আপিলে মনোনয়নপত্র ফিরে পাবেন, তা নিয়ে নিদারুণ সন্দেহ আছে। অনেক তুচ্ছ কারণে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হলেও ক্ষমতাসীন দলের কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ার খবর আমরা গণমাধ্যমে দেখিনি। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী, যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন, তাদের অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী যাতে নিজ দলের ভেতর থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়েন, তা আগেই নিশ্চিত করা হয়েছে।

নির্বাচনী মাঠে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে এর সভানেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি অংশ নেবেন। এবারের নির্বাচনে শুধু প্রধানমন্ত্রীই স্বপদে বহাল থাকছেন না, সংসদ সদস্যরাও বহাল থাকছেন। এর ফলে প্রশাসনের ওপর ক্ষমতাসীন দলের যেমন একচ্ছত্র প্রভাব আছে, তেমনি ভোটের মাঠেও তাদের সরব উপস্থিতি রয়েছে। অপর দিকে, প্রধানমন্ত্রীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়া থাকছেন জেলে। তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না এবং নির্বাচনী প্রচারণাতেও থাকতে পারছেন না। ফলে ভোটের মাঠ মোটেও ‘সমতল’ নয়।

আইন-আদালতের মারপ্যাঁচে বেগম জিয়ার নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। যে ছয়টি আসনে বিএনপির প্রার্থী থাকছেন না, এর তিনটিতে তারই নির্বাচন করার কথা ছিল। এসব আসনে নিশ্চিতভাবে ক্ষমতাসীন দল বা জোটের প্রার্থী বিজয়ী হবেন। অর্থাৎ ভোটের আগে এই আসনগুলোতে বিজয় নিশ্চিত হয়ে গেল। এর মধ্যে ‘বিএনপির ঘাঁটি’ বলে পরিচিত বগুড়ার একটি আসন আছে। মনোনয়ন বাতিল হওয়া বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন, যারা একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। শুধু বিএনপি নয়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অনেক নেতারও মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে না। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রধান দাবি ছিল, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ধরপাকড় বন্ধ করা এবং নেতাকর্মীদের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া। বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে রাজনৈতিক মামলার তালিকাও দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ‘গায়েবি’ মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু বিরোধী দলের এসব দাবিতে নির্বাচন কমিশন কোনো সাড়া দেয়নি। এরপর বিরোধী দলের আরেকটি প্রধান দাবি ছিল, প্রশাসনে প্রয়োজনীয় রদবদল আনা। বিরোধী দলের এ দাবিও এক রকম নাকচ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রবল আপত্তির মুখে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারকে বদলি করা হলেও সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে গাজীপুরের বিতর্কিত পুলিশ সুপারকে; যিনি সাবেক সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুককে প্রকাশ্যে বেদম মারধর করেছিলেন। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের ‘এজেন্টমুক্ত’ রাখতে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন এই ব্যক্তি। এই বদলি নিয়ে শুধু হাস্যরসের সৃষ্টি হয়নি, প্রশাসন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড থেকে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট যে, তারা নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ছকের মধ্য থেকেই কাজ করছেন। তারা নিজেরা এই ছকের বাইরে যাবেন না। নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছেন- ‘আমরা সরকার নই, নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনকালীন হোক আর যেটা হোক, একটা সরকার আছে। তাদের দায়িত্ব তো আমাদের পালন করার কথা নয়।’ নির্বাচন কমিশনারের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকার যে প্রতিবন্ধকতাই সৃষ্টি করুক না কেন, নির্বাচন কমিশন তাতে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন দলকে যে এগিয়ে রেখেছে, এটাও সরকারের ইচ্ছার বাস্তবায়ন মাত্র। এখন মাঠের নিয়ন্ত্রণ যাতে ক্ষমতাসীন দলের হাতেই থাকে, সে জন্য নির্বাচন কমিশন শুধু এক চোখ বন্ধ করে থাকছে।

নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর সরকারের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন কাজ আরো স্পষ্ট হবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিরোধী দলের নির্বাচনী প্রচারণা শুধু বাধাগ্রস্ত হবে না, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে অভিযান শুরু করবে, তাতে বিরোধী নেতাকর্মীদের এলাকায় থাকাই দুরূহ হয়ে পড়তে পারে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে; সে আশা আমাদের পূরণ হয়েছে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।’

নির্বাচন কমিশন যে প্রক্রিয়ায় মনোনয়নপত্র বাছাই করেছে কিংবা বিরোধী দলের অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেনি, তাতে নির্বাচন কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, তা বোঝার জন্য ভোটের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, শেষ পর্যন্ত কতজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভোটের মাধ্যমে দেখা যাবে, তা এখন অনুমান করা সম্ভব নয়। অপর দিকে নির্বাচন ‘অংশগ্রহণমূলক’ হচ্ছে বটে, কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি।

নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের পক্ষ থেকে পোলিং এজেন্টদের তালিকা নির্বাচন কমিশনকে দিতে হবে। সেই তালিকা ধরে নতুন করে ধরপাকড় শুরু হতে পারে। ফলে বিরোধী দলের সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন নেতাকর্মীদের হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। গাজীপুর, রাজশাহী ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা এমন পরিস্থিতি দেখেছি। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন এমপির দাপট তো থাকবেই। এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি পদক্ষেপে ক্ষমতাসীন দল জোরালো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। খালেদা জিয়াসহ বিএনপির ডজনখানেক সিনিয়র নেতা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ না পেলেও আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করছেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের নেতারা প্রশাসনে রদবদলের দাবি করে এলেও সাথে সাথে ক্ষমতাসীন দল রদবদল না করার দাবি জানিয়ে আসছে।

বিএনপি এবং ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের যে প্রক্রিয়ায় গণহারে মনোনয়নপত্র বাতিল করা হলো, তা যে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিকল্পনার ফল নয়, তা নিশ্চিত করে বলা যায় কি? অপর দিকে, যে ৮১টি আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, এসব আসনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা নির্বাচনের আগেই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। ভোট তো শেষ বিচারে অঙ্কের খেলা। ৩০০ আসনের এই খেলায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়াই মূল কৌশল। যদি নির্বাচনের আগে বা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় ক্ষমতাসীন দল ৬০ থেকে ৭০ আসনে বিজয় নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে তাদের বিজয়ী হওয়ার পথ অনেকখানি এগিয়ে যায়। বাকি আসনগুলো নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নিশ্চয়ই পরিকল্পনা আছে। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন স্টাইলে কিছু আসনে এজেন্টবিহীন নির্বাচন আর কিছু আসনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মহড়াও হতে পারে। বাইরে ভোটারের ‘শান্তিপূর্ণ’ লাইন দেখা যেতে পারে।

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, নির্বাচন কমিশন যদি ক্ষমতাসীন দলের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন কিভাবে হবে? বাস্তবতা হচ্ছে, সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার মতো পরিবেশ এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। আগামী দিনগুলোতে এমন পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা করা যায় না। অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে কখনো নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হতে পারে না। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে একটি সাজানো নির্বাচন হতে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দু’টি দেশ শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে সম্প্রতি সাজানো নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছিল। বাংলাদেশের চেয়ে এই দু’টি দেশে ভোটার সংখ্যা কম। কিন্তু তারপরও এ দু’টি দেশে ক্ষমতাসীন দল বিজয়ী হতে পারেনি। এর প্রধান কারণ, ভোটাররা ভোট দেয়ার ব্যাপারে ছিলেন অনড়।

বাংলাদেশে যদি প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও ভোটাররা ভোট দিতে বেরিয়ে আসেন, তাহলে পুরো পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। সুবিধাভোগী কিছু কর্মকর্তা ছাড়া মানুষের অধিকারের ব্যাপারে প্রশাসন বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। কারণ, ভোট হচ্ছে জনগণের শক্তি। এ ছাড়া তরুণ ভোটাররা এবার হবেন নির্বাচনের প্রধান ফ্যাক্টর। এর মধ্যে আড়াই কোটি নতুন ভোটার এবার প্রথম ভোট দেবেন। নিশ্চয়ই এই তরুণ ভোটাররা তাদের অধিকার প্রয়োগের জন্য ভোটকেন্দ্রে যাবেন। ক্ষমতাসীন দলকে নিশ্চয়ই এ দিকটি বিবেচনায় নিতে হবে। এদের অধিকার যদি হরণ করা হয়, তাহলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হবে; যা রাষ্ট্র পরিচালনায় দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা এবং তারা নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে কতটা সোচ্চার, তার প্রতিফলন দেখা যাবে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনের মাঠে টিকে থাকা নির্ভর করবে ভোটারদের, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাথে কতটা সম্পৃক্ত করতে পারবেন, এর ওপর।

আলফাজ আনাম

alfazanambd@yahoo.com

Nayadiganta

print

LEAVE A REPLY