আওয়ামী লীগ কী নার্ভাস?

ছয় মাস আগেও আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা মনে করতেন শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে আসবে না। বিএনপি যদি নির্বাচনে আসেও, তাহলেও তারা খন্ডিত এবং বিভক্তভাবে নির্বাচনে আসবে। নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপির বিভক্তি অনিবার্য এটা আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা ধরেই নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি ধারণা ছিল যে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যারাই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবে, তাদের জয় অনিবার্য। ২০১৪ সালের যে অভিজ্ঞতা সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আওয়ামী লীগ এত উৎসাহী ছিল বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে। কিন্তু বিএনপির আকস্মিকভাবে নির্বাচনে আসা এবং নাটকীয়ভাবে ঘোষণা দেয়া কোনমতেই নির্বাচন থেকে সরে যাবে না। তাতে কি আওয়ামী লীগ কী একটু হলেও নার্ভাস?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন যে, হ্যা আওয়ামী লীগের মধ্যে বেশকিছু বৈশিষ্ঠ্য পরিলক্ষিত হয়েছে যাতে মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ নির্বাচন নিয়ে কিছুটা হলেও মনস্তাত্বিক ভাবে পিছিয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগের বেশকিছু প্রার্থীর মধ্যে অস্বস্থি এবং নার্ভাসনেস দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগে যে অস্বস্থি এবং নার্ভাসনেস তার মূল কারণগুলো হল:

১. অতি আত্নবিশ্বাস: আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। সেই সময় যারা এমপি হয়েছেন, তারা আশা করেননি এই সংসদ পাঁচ বছর মেয়াদে থাকবে। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ৫ বছর দেশ পরিচালনা করেছে। এরফলে আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি অতি আত্নবিশ্বাস তৈরী হয়েছিল। আওয়ামী লীগ মনে করেছিল, এবারও বিএনপি শেষ পর্যন্ত হয়তো নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে পারবে না। এই অতি আত্নবিশ্বাসের কারণে হঠাৎ করে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহন আওয়ামী লীগকে কিছুটা হলেও নার্ভাস করেছে।

২. তৃনমূলের বিভক্তি: আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষমতায় আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে যেটা হয় সেটা হলো, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা বৃদ্ধি পায় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। আওয়ামী লীগের এখন প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একাধিক ব্যক্তি রয়েছেন যারা নিজেদের মনে করেন তারা সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য। এবার শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাশিদের বিদ্রোহ দমন করতে পারলেও, কর্মীদের যে বিদ্রোহ এবং অসন্তোষ, তা এখন পর্যন্ত প্রশমন করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। দলটি নির্বাচনের মাঠে যাবে একটি বিভক্ত দল নিয়েই। এই বিভক্ত দল নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে কতটা সুবিধা দিবে তা নিয়ে অস্বস্তিতে আছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা।

৩. দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সমস্যা: তৃতীয় বিশ্বের যেকোন রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে সেই রাজনৈতিক দলটি জনপ্রিয়তা হারাতে বাধ্য হয়। কারণ জনগনের যে পর্বতসম চাহিদা এবং যে আকাঙ্খা, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা চলতে পারে না। সমস্ত কার্যক্রম সেমতো হয় না। তাছাড়া ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় তাদের বিভিন্ন কাজকর্ম জবাবদিহিতার আওতায় আসে না বলে জনমনে নানা রকম অসন্তোষ তৈরী হয়। বিগত ১০ বছরে দেখা গেছে যে আওয়ামী লীগের একাধিক এমপির বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে নানা দুর্নীতি এবং সন্ত্রাসসহ নানা অভিযোগ উঠেছিল। এই সমস্ত অভিযোগগুলোর ব্যাপারে জনগন সুস্পষ্ট সমাধান পায়নি বলেই অনেকে মনে করেন। যার ফলে নির্বাচনে মাঠে জনগন এই সমস্ত অভিযোগগুলোর ব্যাপারে একটা পক্ষপাত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নিবে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছে। সেটা আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা কিছুটা হলে জানেনও। সেজন্য আওয়ামী লীগ কিছুটা হলেও নার্ভাস।

৪. বেশি মাত্রায় প্রশাসন এবং আমলা নির্ভর: আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের নিয়ন্ত্রনে রয়েছে। আওয়ামী লীগ এ সময়ে সাংগঠনিক নির্ভরতার চেয়ে আমলা- আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসনের উপর বেশি মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা শেষ পর্যন্ত কতটা আওয়ামী লীগের পক্ষে থাকবে তা নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। এটা নিয়েও আওয়ামী লীগ কিছুটা হলেও নার্ভাস।

৫. শেখ হাসিনার একক জনপ্রিয়তা: এটা লক্ষনীয় যে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বাধিক জনপ্রিয় ব্যাক্তিত্ব। সর্বশেষ জরিপগুলোতে দেখা যায় যে, ৬৭ থেকে ৭০ ভাগ মানুষ শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে পছন্দ করছেন। কিন্তু সমস্যা হলো যে, আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনা ছাড়া তৃতীয় কোন নেতা নেই। আওয়ামী লীগের এবার নির্বাচনী বৈতরনী পাড় হতে হবে শেখ হাসিনার একক জনপ্রিয়তার উপর নির্ভর করে। কিন্তু শেখ হাসিনার একক জনপ্রিয়তা কী আওয়ামী লীগকে ৩০০ আসনে জেতাতে পারবে? এ নিয়ে আওয়ামী লীগের অধিকাংশ ইমেজ সংকটে থাকা নেতার সংশয় রয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে স্থানীয়দের একটি জনবিচ্ছিন্নতা তৈরী হয়েছে। শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তাই তাদের একমাত্র পুঁজি।

এই অস্বস্তি এবং নার্ভাসনেস নিয়েই নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগ যাচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগের নেতারা আশাবাদি তারা গত ১০ বছর ধরে যে উন্নয়ন করেছে, সে উন্নয়নের ধারবাহিকতা রক্ষার জন্য জনগন তাদেরকে ভোট দিবেন। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, জনগন এখন অনেক সচেতন হয়েছেন। গত এক দশকে যে উন্নয়ন হয়েছে। সে উন্নয়নের পক্ষেই রায় দিবে বলে আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করেন।

বাংলা ইনসাইডার

print

LEAVE A REPLY