১০ মিনিটেই সব ধরনের ক্যান্সার শনাক্ত: সাড়া ফেললেন বাংলাদেশের যে বিজ্ঞানী

ইউনিভার্সেল ক্যান্সার বায়োমার্কারের মাধ্যমে মাত্র ১০ মিনিটেই সব ধরনের ক্যান্সার শনাক্ত করা যাবে-এমন প্রযুক্তি আবিষ্কার করে বিশ্বে সাড়া ফেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন বিজ্ঞানী। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুখবরটি হলো, এই গবেষণাকাজের নেতৃত্বে থাকা তিনজনের একজন বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. আবু সিনা।

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণা বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’ এ প্রকাশিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে হইচই পড়ে গেছে। বিশ্বের প্রথম সারির গণমাধ্যম সিএনএন, ফোর্বস, নিউইয়র্ক পোস্ট, ইউএসএ টুডে, গার্ডিয়ান, টেলিগ্রাফ, কুরিয়ার মেইল এবং দি অস্ট্রেলিয়ানসহ এবিসি নিউজ, সেভেন নিউজ, ৯ নিউজ, সিটিভি নিউজ এবং সিবিসি নিউজের মতো টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ড. আবু সিনার সাক্ষাৎকারটি বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে|

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের এই সহকারী অধ্যাপক কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট ফর বায়োইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড নানোটেকনোলোজি থেকে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করতে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান| বর্তমানে রির্সাচ ফেলো হিসেবে ক্যান্সার নিয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছেন তিনি। তার সঙ্গে এই গবেষণার নেতৃত্ব আরও ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী ড. লরা কারাসকোসা এবং প্রফেসর ম্যাট ট্রাউ।

মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানতে চাইলে বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে ড. সিনা আমাদের সময়কে বলেন, ‘দীর্ঘ শ্রমসাধনা আর গবেষণায় লিপ্ত থেকে ক্যান্সার শনাক্তকরণের প্রাথমিক এই পদ্ধতি আমরা আবিষ্কার করতে পেরেছি। ’

ক্যান্সার সনাক্তে এই পদ্ধতি কীভাবে কাজ করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই গবেষণার মাধ্যমে আমরা ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর ডিএনএ’র এমন একটি বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেছি, যেটি সকল ক্যান্সারের ক্ষেত্রে দেখা যায়। তাই এটাকে আমরা ক্যান্সারের ইউনিভার্সেল বায়োমার্কার হিসেবে চিহ্নিত করেছি।’

ড. সিনা আরও বলেন, ‘ক্যান্সার শরীরের যেকোনো অঙ্গে শুরু হতে পারে। একেক অঙ্গের ক্যান্সার একেকরকম এবং তাই ভিন্ন ভিন্ন ক্যান্সারের বায়োমার্কার যেমন ভিন্ন, তেমনি টেস্ট করার পদ্ধতিও ভিন্ন। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিজ্ঞানীরা এতদিন এমন একটি ইউনিভার্সেল বায়োমার্কারের সন্ধান করছিলেন, যেটি সকল ক্যান্সারের একটি কমন বৈশিষ্ট্য বহন করবে এবং যেটি বডি ফ্লুইড যেমন রক্ত, ইউরিন বা মুখের লালাতে পাওয়া যাবে।’

এই বিজ্ঞানী বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই রক্তে ডিএনএ ভিত্তিক এই বায়োমার্কারের উপস্থিতি পেয়েছি এবং আশা করছি এই বায়োমার্কারটি ইউরিন এবং মুখের লালাতেও পাওয়া যাবে। ক্যান্সার নির্ণয়ে এই টেস্টটির পদ্ধতি খুবই সহজ। মানুষের শরীর থেকে রক্ত অথবা টিস্যু স্যাম্পল নিয়ে সেখান থেকে ডিএনএটা বের করে নিতে হবে। এরপর সেই ডিএনএ গোল্ড ন্যানো পার্টিকেলের সঙ্গে মেশানোর পর ক্যান্সার থাকলে এটার কোনো পরিবর্তন হবে না। কিন্তু যদি ক্যান্সার না থাকে তাহলে এটা নীল রঙে পরিবর্তন হবে। ’

ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল বা তড়িৎরসায়ন পদ্ধতিতেও কারেন্ট সিগন্যাল মেপে এক ধরণের মেশিনের মাধ্যমে ক্যান্সারের এই পরীক্ষা করা সম্ভব। ভবিষ্যতে হয়তো এই মেশিনটি আরও ছোট আকারে তৈরি করা গেলে একসময় মোবাইল ফোনের সাথে মেশিনটি কানেক্ট করেই ক্যান্সার নির্ণয় করা যাবে।’

ড. আবু সিনা বলেন, ‘এই আবিষ্কারটি বিশ্বে সাড়া ফেলার অন্যতম কারণ হলো- এর ইউনিভার্সেল বৈশিষ্ট্য এবং সহজ ব্যবহার পদ্ধতি। তাছাড়াও তিনি মনে করেন নেচার কমিউনিকেশন্স এর মত বিখ্যাত জার্নালে প্রকাশিত হওয়ার কারণে এই কাজটি এত গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে| তিনি বলেন আমাদের আবিষ্কৃত এই টেস্টটি একবার পরীক্ষার মাধ্যমেই সকল ক্যান্সারের উপস্থিতি বলে দিতে পারবে এবং এর মাধ্যমে ক্যান্সারের হাত থেকে লাখো মানুষকে বাঁচাতে পারবে। কারণ, এই টেস্টের মাধ্যমে যদি আগেই বুঝে ফেলা যায় আমাদের শরীরে ক্যান্সার বাসা বাঁধছে, তাহলে প্রাথমিক পর্যায়ে ন্যূনতম চিকিৎসার মাধ্যমে দেশেই এই রোগের নিরাময় সম্ভব।’

বর্তমানে তাদের এই টেস্টটি এখন পর্যন্ত ২০০টি রক্ত ও টিস্যু স্যাম্পল এ পরীক্ষা করে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সঠিকভাবে ক্যান্সার নির্ণয় করতে পেরেছে। তবে এই টেস্টটি মানুষের কাছে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে হলে বেশি পরিমাণ স্যাম্পল সংগ্রহ করে বড় ধরনের ক্লিনিকাল পরীক্ষা করতে হবে। যেটি অনেক সময়সাপেক্ষ বিষয় বলে জানান তিনি।

ইতিমধ্যেই আমেরিকা, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে বহু গবেষক তাদের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহ প্ৰকাশ করেছেন। বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশকেও এই ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার একটি অংশ করতে চান বলে জানান ড. সিনা।

বাংলাদেশ চাঁদপুর জেলার বাবুরহাটে জন্মগ্রহণকারী এই গর্বিত বাংলাদেশি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর কর্মজীবনের শুরুতে কাজ করেছেন বার্জার পেইন্টসে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান যোগদান করার পর পিএইচডি করতে অস্ট্রেলিয়া চলে যান। বর্তমানে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে বসবাস করছেন তিনি।

নিজের স্বপ্নে কথা জানতে চাইলে তিনি জানান, একজন বাংলাদেশি হিসেবে এই গবেষণার সাফল্য যদি তিনি দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন তাহলে সেটাই হবে তার সত্যিকারের

print

LEAVE A REPLY