হামলা থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধাও!

মাথায় পুলিশের রাইফেলের আঘাতে আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে জাহানারা বেগম (৬০)। গত সোমবার বিকেলে মুরাদনগরের লাজুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে তাকে কুমিল্লা মেডিক্যাল সেন্টারে ভর্তি করা হয়। এখন হাসপাতালের ৫৪০ নং বেডে অর্থপেডিকস বিশেষজ্ঞ ডা: মাইনুল হাসান সোহেল, স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ মশিউর রহমান এবং এন এম শাহজাহানের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।

ডা: শাহজাহান নয়া দিগন্তকে বলেন, উনি মাথায় আঘাত পেয়েছেন। বাম দিকের কানের ওপর কেটে যাওয়ায় সেলাই দেয়া হয়েছে। মাথার ভেতরে রক্ত জমা আছে কি না সেটা সিটিস্ক্যান করানোর পর জানা যাবে। আর গলার একটি হাড় ভেঙে গেছে। তার চিকিৎসা চলছে বলে জানান তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার বিকেল ৩টায় কুমিল্লা-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী জুন্নুন বসরি তার নির্বাচনী এলাকা দক্ষিণ মুরাদনগরের বাপটিপাড়া ইউনিয়নের লাজুরে গণসংযোগে করতে যান।

এ সময় হঠাৎ করেই পুলিশ রাসেল মুন্সি, হোসেন মুন্সি, সজিব মুন্সিকে আটকের পর মারধর করেন মুরাদনগর থানার এসআই কবির। এমন সময় আটকদের পুলিশ সিএনজিতে তুলে চলে যেতে চাইলে আটক হওয়া রাসেল মুন্সির মা জাহানারা বেগম এগিয়ে আসেন। তার ছেলে অপরাধী নয় কেন তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে জানতে চান। এ সময় পুলিশ সদস্যরা রাইফেলের বাঁট দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। এ ছাড়াও জোরপূর্বক আসামিদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ সদস্যের গাড়িতে ধাক্কা লেগে বুকের হাড় ভেঙে যায়। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় কুমিল্লা মেডিক্যাল সেন্টারে ভর্তি করা হয়।

সূত্র জানায়, গ্রেফতারের ঘটনার পরপরই একই দিন সন্ধ্যায় এসআই কবিরের নেতৃত্বে সশস্ত্র হামলাকারীরা জাহানপুর ইউনিয়নের ছয়বারের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তৌফিক মীরের বাড়িতে ব্যাপক হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ সময় তার বাড়িতে নারী ও শিশু ছাড়া কেউ উপস্থিত ছিলেন না। পুলিশের এই তাণ্ডবে শিশুরা কান্নকাটি করে। পুলিশ এ সময় গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিলে চেয়ারম্যানের স্ত্রী জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

এ সময় হামলাকারীরা তাদের বাড়িতে থাকা প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা এবং সাত ভরি স্বর্ণের গয়না লুট করে।

এ দিকে দুর্ঘটনায় পা ভেঙে বিছানায় পড়ে থাকা ব্যক্তিকে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো, দাঙ্গা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার আসামি করা হয়েছে। মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা থানায় ২১ ডিসেম্বর বিএনপির ৮২ জনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় বিছানায় পড়ে থাকা ওই ব্যক্তিকে আসামি করায় এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, নাশকতার কোনো ঘটনা না ঘটলেও কুমিল্লা-৩ সংসদীয় আসনে বিএনপির নেতাকর্মীদের মামলা দিয়ে গ্রেফতার ও হয়রানি করা হচ্ছে। অংশ হিসেবে ২১ ডিসেম্বর ৪২ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা-বানোয়াট মামলা করা হয়েছে।

অভিযোগে জানা গেছে, কোনো ধরনের ঘটনা ছাড়াই গত ২১ ডিসেম্বর বাঙ্গরা থানাধীন টনকি নামক গ্রামে গায়েবি ঘটনার অবতারণা ঘটিয়ে থানায় বিএনপির ৮২ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ওই মামলায় যাদের আসামি করা হয় তারা অনেকেই এলাকায় ছিলেন না। তাদের মধ্যে একজন অন্য মামলায় উচ্চ আদালতে জামিন নিতে ঢাকা গিয়ে দুর্ঘটনায় পা ভেঙে বিছানায় কাতরাচ্ছেন। মামলার তারিখের ১০-১২ দিন আগে থেকেই তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাকেও ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে।

তার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মো: কাইয়ুম মোল্লা দীর্ঘ দিন ধরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি চলাফেরাও করতে পারছেন না, তারপরও মামলা থেকে রেহাই পাননি মো: কাইয়ুম মোল্লা।

গত শুক্রবার রাতে ধানে শীষের প্রচার-প্রচারণার সময় ১১ জন বিএনপির সমর্থককে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা। বিএনপির এসব প্রচারকর্মীকে হকিস্টিক ও দেশীয় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে দীর্ঘ সময় পর মুরাদনগর থানায় খবর পাঠানো হয়। পরে ওসি ফোর্স পাঠালে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা মিলে ওই ১১ জনকে থানায় নিয়ে যায়।

এ দিকে মুরাদনগরে এখন ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশ প্রশাসন সরাসরি নৌকার পক্ষে অবস্থান নিয়ে ধানের শীষের নেতাকর্মী, ভোটারদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চলছে। গত ১৯ ডিসেম্বর থেকে ২৬ ডিসেম্বর এই সাত দিনে প্রায় ৬০০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নতুন করে সাতটি মামলা হয়েছে। ৯০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ধানের শীষের প্রার্থী মুজিবুল হক।

তিনি সিইসির কাছে লিখিত এক অভিযোগে বলেন, আমার সহস্রাধিক নেতাকর্মী ও ভোটারের বাড়ি গিয়ে হানা দিয়েছে। গত ২১ ডিসেম্বর ধানের শীষের প্রচারকালে আমার ১১ জন নেতাকর্মীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা। গত ২০ ডিসেম্বর মুরাদনগরের পাহাড়পুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান তোফায়েল শিকদারকে রাতে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তার কাছে ১০টি ককটেল পাওয়া গেছে এমন কাল্পনিক, সাজানো অভিযোগে মামলা দেয়া হয়েছে। প্রতিদিনই এমন ঘটনা ঘটছে।

মুরাদনগর থানা ও বাঙ্গরা বাজার থানা পুলিশ নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। ওই দুই ওসি বলে বেড়াচ্ছেন, ২৫ ডিসেম্বরের পরে বিএনপির নেতাকর্মীদের কেউ এলাকায় থাকলে ভয়াবহ অবস্থা হবে, পুলিশের এমন একপেশে ভূমিকার পাশাপাশি গত ২০ ডিসেম্বর থেকে নৌকার প্রার্থীর ক্যাডাররা বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নানাভাবে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।

ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে। আমার প্রায় সব ইউনিয়নের নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে, কোনো পথসভা ও উঠান বৈঠক করতে দেয়া হচ্ছে না। নৌকার প্রার্থী আমাদের বিরুদ্ধে নানা প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে ও ষড়যন্ত্র করছে এবং সেই অনুযায়ী মামলা করছে। আমার জীবননাশেরও হুমকি দেয়া হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে, ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেয়ার জন্য মুরাদনগর ও বাঙ্গরা থানার ওসির প্রত্যাহার দাবি করেন তিনি।

উৎসঃ   দৈনিক নয়া দিগন্
print

LEAVE A REPLY