‘নকল করেছিলাম পাস করার জন্য, পেয়ে গেছি জিপিএ-৬’

প্রভাষ আমিন

১. জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ঢাল বানিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের পর বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে দারুণ উদ্দীপনা ছিলো। শুরুতে এমন একটা পারসেপশন তৈরি হয়েছিলো, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ঐক্যফ্রন্ট জিতবে। কিন্তু দ্রুতই সে পারসেপশন পাল্টে যায়। ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গি দেখে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে তৃণমূলে। ঐক্যফ্রন্টকে দিলে ভোট নষ্ট হবে, এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ে দ্রুতই। তাই আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন অনুমিতই ছিলো। নানান জরিপও বলছিলো, আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আসছে। মার্কিন দূতাবাসের পক্ষে করা এক জরিপে আওয়ামী লীগ জোট ১৬৩ আসন পাবে বলা হয়েছিলো। রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার-আরডিসি দুটি জরিপ করেছে- ডিসেম্বরের শুরুতে জরিপে পূর্বাভাস ছিলো আওয়ামী লীগ জোট পাবে ১৬৩ আসন। আর শেষ দিকে মানে ২৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত আরডিসির জরিপে বলা হয় আওয়ামী লীগ জোট ২৪৮ আসন পাবে। সব জরিপেই আওয়ামী লীগের অবশ্যম্ভাবী প্রত্যাবর্তনের গল্পই লেখা হয়েছে। আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আসছে, এটা মেনে নিয়েও অনেকে আরডিসির দ্বিতীয় জরিপের সমালোচনা করেছেন, একতরফা বলে। কিন্তু তখনো কেউ ধারণাই করতে পারেননি, ৩০ ডিসেম্বর কী চমক আসছে। সব জরিপ, সব জল্পনা-কল্পনাকে উড়িয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ জোট জিতলো ২৮৮ আসনে। এরপর কি আর কেউ এইসব ভুয়া জরিপে বিশ্বাস করবে?

২. ৩০ ডিসেম্বর রাতে অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য ফলাফলে ঐক্যফ্রন্ট শোকে স্তব্ধ আর আওয়ামী লীগ শিবির আনন্দে বাকহারা। এক পক্ষ অধিক শোকে, আরেক পক্ষ অধিক সুখে পাথর। ফেসবুকে নির্বাচন নিয়ে ট্রল বেশি করেছেন আওয়ামী লীগাররাই। ১৫ দিন ধরে ফেসবুক আমার একাউন্টটিকে ‘ফেক’ বলে ডিজঅ্যাবল করে রেখেছে। তাই ফেসবুকের নির্বাচনী ইমো (রসড়) মিস করেছি। কিছু শোনা কথা শেয়ার করতে পারি। নির্বাচনের রাতে একজন লিখেছিলেন, মাঝি বৈঠা একটু আস্তে মারেন, ৩০১ হয়ে যেতে পারে। আরেক আওয়ামী লীগ সমর্থক লিখেছিলেন, মানুষ কামান চায় বন্দুক পাওয়ার আশায়। আর আমরা বন্দুক চেয়ে কামান পেয়ে গেছি। আওয়ামী লীগ সমর্থকরা চেয়েছিলেন, দল আবার ক্ষমতায় আসুক, ১৫১ আসন পেয়ে হলেও। কিন্তু ২৫৯ আসন তাদের কল্পরায়ও ছিলো না। সবচেয়ে ভালো বলেছেন শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু। তিনি লিখেছেন, ‘কোনোরকমে টেনেটুনে পাস করার জন্য নকল করেছিলাম। রেজাল্টে দেখি জিপিএ-৬ পেয়ে গেছি।

৩. গত একমাসে জাতীয় পার্টি যা যা করেছে, তা একসাথে করলে একটা কমেডি সিনেমার দারুণ স্ক্রিপ্ট হয়। মনোনয়নের পুরোটা সময় এরশাদ পালিয়ে থাকলেন সিএমএইচে। নিচে বাঁচতে মহাসচিব পদ থেকে রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে দিলেন। আবার প্রচারণা শুরুর দিন অর্থাৎ ১০ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগে হাওলাদারকে দলের বিশেষ সহকারী বানিয়ে দেন। জানিয়ে দেন, তার অনুপস্থিতিতে হাওলাদারই হবেন দলের ‘দ্বিতীয় ব্যক্তি’, তিনিই চেয়ারম্যানের সার্বিক সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু জাতীয় পার্টির দ্বিতীয় ব্যক্তি হওয়ার কথা রওশন এরশাদের, কারণ তিনিই দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান। কিন্তু কে সত্যিকারের দ্বিতীয় তার কোনো জবাব মিললো না। তার মানে দুজনই ‘দ্বিতীয় ব্যক্তি’। নির্বাচনী প্রচারণার পুরো সময়টা সিঙ্গাপুরে কাটিয়ে দেশে ফিরেই এরশাদ এমপি হয়ে গেলেন, তার দল পেলো ২২ আসন। যেখানে বিএনপি পেয়েছে মাত্র ৫ আসন।

এখন দ্বিধা জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে, তারা সরকারি দল হবে না বিরোধী দল হবে? নিজেরা লম্বা বৈঠক করেও তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তারা তাকিয়ে সরকারি দলের দিকে। আসলে অপেক্ষা করছেন, শেখ হাসিনা কী বলেন, সেটার জন্য। তবে এবারও জাতীয় পার্টি দশম সংসদের মতো একই সঙ্গে বিরোধী দলেও থাকবে, সরকারেও থাকবে; এটা অনেকটাই নিশ্চিত।

এরইমধ্যে এরশাদ দলে তার উত্তরসূরি ঘোষণা করেছেন। তার অবর্তমানে দলের দায়িত্ব নেবেন কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তার মানে তিনিই জাতীয় পার্টির ‘দ্বিতীয় ব্যক্তি’। তাহলে কী দাঁড়ালো? জাতীয় পার্টিতে এখন ‘দ্বিতীয় ব্যক্তি’ তিনজন- সিনিয়র কো চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ, বিশেষ সহকারী রুহুল আমিন হাওলাদার এবং কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের। পার্টি বটে একটা।

লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

print

LEAVE A REPLY