রাজশাহীতে সহিংসতা চলছেই, এলাকা ছাড়া বিএনপি-জামায়াত

জেলার তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলাসহ বিভিন্ন স্থানে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মী ও তাদের সমর্থকদের ওপর নির্বাচনী পরবর্তী সহিংসতা থামছেই না। নির্বাচন শেষ হওয়ার পাঁচদিন পার হলেও চলছে হামলা-লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। ফলে আতঙ্কে বিএনপি-জামায়াত ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এলাকা ছাড়া। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মাঝেও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এরমধ্যে তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলায় সহিংসতা মাত্রা ছাড়িয়েছে। দুটি উপজেলা নিয়ে রাজশাহী-১ আসন গঠিত। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে ভোটের মাঠে সরব থাকা নেতাকর্মী ও সমর্থকদের খুঁজে খুঁজে হামলা চালাচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। বেশিরভাগ বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মী এখন এলাকাছাড়া। তাদেরকে খুঁজে না পেয়ে বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং লুটপাট চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একের পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কার্যত নীরব ভূমিকায় আছে। থানায় অভিযোগ দিতে গেলেও পুলিশ নিচ্ছে না।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা পুলিশের মুখপাত্র আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “সহিংসতা সৃষ্টিকারী বেশ কয়েকজনকে আমরা গ্রেফতার করেছি। গোদাগাড়ী থানায় মামলা হয়েছে, সেগুলো তদন্ত কাজ চলছে। সহিংসতা ঠেকাতে তানোর ও গোদাগাড়ী এলাকায় পুলিশ তৎপর রয়েছে।”

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দাবি ভোটের পরও এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ভোটের দিন সংঘর্ষে তানোরে আওয়ামী লীগ নেতা মোদাচ্ছের আলী এবং মোহনপুরে ইসমাইল হোসেন মারা যান। তাদের আত্মীয় স্বজনরা ওই ঘটনায় জড়িত বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা সংহিংসতার ঘটনায় জড়িত নয়।

তানোর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, তিনি তানোর এলাকায় ডিশলাইনের ব্যবসা করেন। ভোটের পর থেকে উপজেলার সর্বত্র আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার গজ ডিশলাইনের তার কেটে ফেলেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার পারিশো দুর্গাপুর বাজারে ডিশলাইনের নেটওয়ার্ক অফিসের সব সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে গেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

তিনি বলেন, “ভোটের পর থেকে প্রতি রাতেই তানোরের বিভিন্ন স্থানে আমার ডিশলাইনের কেবল কেটে ফেলাসহ সঞ্চালন লাইনগুলো কেটে আগুন দেওয়া হচ্ছে। ফলে শত শত কেবল গ্রাহক চার দিন ধরে কোনো স্যাটেলাইট টিভি দেখতে পারছেন না।”

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২ জানুয়ারি তানোরের কলমা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিএনপি সমর্থক শফিকুল ইসলাম কেনাকাটা করতে বিলীবাজারে গেলে যুবলীগ নেতা ময়না চেয়ারম্যানের লোকজন তাকে মারধর করে এবং তার মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে।

এর আগে ১ জানুয়ারি বাধাইড় এলাকার বিএনপি কর্মী বকুলের বাড়ি ও গভীর নলকূপের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে ফেলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। পল্লী বিদ্যুতের লোকজনকে জানালে তারা লাইন ঠিক করতে এসেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হুমকি-ধামকিতে ফিরে যায়। ফলে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় আছে বিএনপির ওই গ্রামের বেশ কয়েজন নেতাকর্মী। গভীর নলকূপ না চালাতে পারায় বোরো ধানের জমিতেও সেচ দিতে পারছেন না তারা।

এদিকে বৃহস্পতিবার (৩ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে গোদাগাড়ীর কুমরপুর বাজারে আওয়ামী লীগের একদল সশস্ত্র নেতাকর্মী কয়েকটি খোলা গাড়িতে এসে বদর আলী ও টিয়ার মিয়ার ধানের আড়ত, বাহাদুরের কাপড়ের দোকান, শাহীনের কীটনাশকের দোকানসহ বিএনপি নেতাকর্মীদের মোট ১০টি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরে দোকানগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফায়ার সার্ভিসের ৩টি গাড়ি গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

পরদিন শুক্রবার (৪ জানুয়ারি) দুপুরে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি এম খুরশীদ হোসেন ও এসপি মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে সহিংসতার ঘটনা তদন্ত করে জড়িতদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। ঘটনার শিকার ব্যবসায়ী বাহাদুর বলেন, তার দোকান থেকে প্রায় ১৬ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়েছে।

রাজশাহী-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার আমিনুল হক বলেন, ভোটের আগে প্রশাসনিক হয়রানি এবং ভোটের পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বেপরোয়া হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা চলছেই। ফলে অধিকাংশ বিএনপি নেতাকর্মী জানমালের নিরাপত্তা না পেয়ে পরিবার নিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।

এদিকে, জেলার পবা, মোহনপুর, দুর্গাপুর ও পুঠিয়া উপজেলায়ও নির্বাচনী সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। এলাকাছাড়া বিএনপি নেতাকর্মীদের জমি দখল, ধানক্ষেতে সেচ বন্ধ, বাড়ির বিদ্যুৎ ও ডিশ লাইন কেটে দিয়ে একঘরে করে রেখেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ফলে ওইসব এলাকায় বিএনপি-জামায়াত ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পালাবদল

print

LEAVE A REPLY