ছেলেতে ছেলেতে প্রেম ও বিয়ে, অতঃপর…

পিনু জামান ও মাহমুদ হাসান। দু’জনেই ছেলে। বন্ধুত্ব থেকে দু’জনের সম্পর্ক গড়ায় প্রেমে। এখানেই শেষ না, বিষয়টি পৌঁছে যায় বিয়ের আলোচনা পর্যন্ত। বিয়ের শপিং করা হয়েছিল লাখ লাখ টাকার। আমন্ত্রণ করা হয়েছিল বহু আত্মীয়স্বজনকে। পারিবারিকভাবেই সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন হাসান। ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়।

বাস্তব এই ঘটনাটি হার মানিয়েছে ফিল্মের কাহিনীকেও। তবে এই গল্পের সমাপ্তিটা মোটেও সুখকর না। স্বপ্ন ও বিশ্বাসভঙ্গের মধ্য দিয়ে এর শেষ। শেষ দৃশ্যে প্রকাশিত হয় ভালোবাসার মানুষের আসল চেহারা। তিনি মূলত একজন প্রতারক।

মাহমুদ হাসান দেশের বাইরে লেখাপড়া করেছেন। দেশে ফিরেই ব্যস্ত হন নিজের কাজ নিয়ে। ফিল্ম ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন। প্রতিদিনই সুন্দরী তরুণীদের সঙ্গে সময় কাটে। কাজে, বন্ধুতায়, আড্ডায়। কিন্তু কেউই তার মন ছুঁয়ে যেতে পারেননি। সুদর্শন মাহমুদ হাসানের সঙ্গে বেশ আগেই পরিচয় হয়েছিল পিনু জামানের। জামান নিজেকে একজন ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দেন। রাজধানীর একটি খ্যাতনামা মেডিকেলে কর্মরত বলে জানান তিনি। ডাক্তার জামানের প্রতিই আকৃষ্ট হন সুদর্শন হাসান। তবে ভালোবাসার এই মানুষটিকে কখনও সরাসরি দেখেননি তিনি। কথা হতো ফোনে। চ্যাট হতো ম্যাসেঞ্জারে। সম্পর্কের সূত্রপাত ফেসবুকের মাধ্যমে।

রাত জেগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন তারা। সারাদিনের কার্জ-কর্ম, কৌতূক, আদর-আহলাদ কোনো কিছুই বাদ যেত না তাদের। দেখা না হলেও জামানের প্রতি এতটুকু ভালোবাসার কমতি ছিল না হাসানের। খাওয়ার আগে একটা কল দিয়ে জেনে নিতেন জামান খেয়েছেন কি-না। অথবা খাওয়া হয়ে গেলে কোথায় কি খেয়েছেন। বিশেষ কোনো সমস্যা হলে ফোনে ফোনে সমাধানের চেষ্টা করতেন। এমনকি আর্থিক সমস্যাও সমাধান করে দিতেন হাসান। দামি দামি গিফট পাঠাতেন পিনু জামানকে। লোক মারফত এসব গিফট পাঠাতেন হাসান। মাঝে-মধ্যেই জামানকে দেখতে ব্যাকুল হয়ে যেতেন তিনি। জামান তাকে বুঝাতেন- বিয়ের আগে দেখা না। এতে আকর্ষণ থেকে যাবে। এই আকর্ষণ ধরে রেখেই হাসানের বাসরে যাবেন জামান। ইউরোপে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হাসানও এক সময় মেনে নেন, বিয়ের আগে দেখা না।

পরিবার থেকে হাসানকে বিয়ে করতে চাপ দেয়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে হাসান জানিয়ে দেন, তার সঙ্গে পিনু জামানের প্রেমের সম্পর্কের কথা। যে কোনোভাবেই তাকেই বিয়ে করতে চান তিনি। পরিবারের তীব্র আপত্তি। কিন্তু হাসান তা মানতে নারাজ। তিনি তার ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে সংসার করতে চান। একপর্যায়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রাজি হয়ে যান মাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। হাসানের পরিবারের সদস্যরা কথা বলেন জামানের সঙ্গে। জামান প্রথমে বিয়ের প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন। কিন্তু হাসানের আগ্রহ ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তিনি সম্মতি জানান। গত ২১শে সেপ্টেম্বর ছিল বিয়ের নির্ধারিত দিন।

বিয়ে উপলক্ষে বাসায় বর্ণিল সাজসজ্জা। বিপুল টাকা ব্যয় করে শপিং করা হয়। পিনু জামানের জন্য ক্রয় করা হয় ৬ লাখ টাকার গহনা। নানা ধরনের ১২ লাখ টাকার কেনাকাটা করা হয়। জামানের কাছে পাঠানো হয় ১০ কেজি মিষ্টি ও ১২ হাজার টাকা মূল্যে কেনা শাড়ি। বিয়ের দিন এই শাড়ি পরতে হবে জামানকে। সেইসঙ্গে পাঠানো হয় দামি মোবাইলফোন, ঘড়ি ইত্যাদি।

বিয়ের আগের দিন ঘটে ঘটনা। জামানের বাসায় যেতে চান হাসানের পরিবারের সদস্যরা। এতদিন গিফট আদান প্রদান হচ্ছিল জামানের পক্ষের এক ব্যক্তির মাধ্যমে। জামানের বাসার ঠিকানা নেই হাসানের কাছে। ঠিকানা চাইলে শান্তিনগর, সিদ্ধেশ্বরী রোডের একটি অসম্পূর্ণ ঠিকানা দেয়া হয়। এমনকি রহস্যজনকভাবে বিয়ে ভাঙ্গার নানা বাহানা করতে থাকে জামান।

সন্দেহ ঘনীভূত হয়। তারপরই সহযোগিতা নেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। সেইসঙ্গে নিজস্ব বিভিন্ন সোর্সের। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রহস্য উন্মোচন হতে থাকে। আর হতভম্ব হন হাসান ও তার পরিবারের সদস্যরা। এ বিষয়ে হাসানের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পিনু জামান যে ছেলে এটা জানা ছিল না হাসানের। পিনু জামান একজন যুবক হলেও তিনি হুবুহু মেয়ে কণ্ঠে কথা বলতে পারেন। ফেসবুকে নন্দিনী চৌধুরী নামে একটি আইডি পরিচালনা করতেন পিনু জামান। নিজেকে মেয়ে পরিচয় দিয়েই হাসানের সঙ্গে প্রেম করেছিলেন। হাসানের কাছ থেকে দামি দামি গিফট গ্রহণ করেছিলেন।

বিষয়টি জানাজানির পর কলাবাগান থানায় একটি মামলা করা হয়। মামলার তদন্ত করে সিটিটিসি’র সাইবার ক্রাইম ইউনিট। গ্রেপ্তার করা হয় নন্দিনী চৌধুরী নামের পিনু জামান সিদ্দিকীকে। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য দিয়েছে জামান। হাসান ছাড়াও বিভিন্ন ছেলের সঙ্গে মেয়ে সেজে, কথা বলে নানা গিফট আদায় করেছে। লুটে নিয়েছে নগদ টাকাও। পিনু জামানের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের পূর্ব মেড্ডায়। সে গাজীপুরের একটি ডায়িং মিলে প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিল।

উৎসঃ   মানবজমিন
print

LEAVE A REPLY