চোর নিয়ে গেল উড়াল সেতুর বৈদ্যুতিক তার

চালু হওয়ার এক বছরের মাথায় চুরি হয়ে গেছে মালিবাগ-মগবাজার উড়ালসড়কের বৈদ্যুতিক তার। এ কারণে নয় কিলোমিটার এই উড়ালসড়কে রাতে একটি বাতিও জ্বলছে না। ফলে রাতের বেলায় যানবাহন চালানো একদিকে হয়ে গেছে ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে।

কেবল আলো জ্বলছে না এমন নয়, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিকল হয়ে আছে উড়ালসড়কের ওপর মৌচাক ও মালিবাগ মোড়ের সংকেত বাতিও। সেখানে থাকে না ট্রাফিক পুলিশও। ফলে নিজ দায়িত্বে মোড় ঘুরতে হয় গাড়িচালকদের।

২০১৭ সালের ২৭ অক্টোবর এই উড়ালসড়ক পুরোপুরি চালু হয়। এর আগেও দুই ধাপে চালু হয় দুটি লুপ। এটি চালু হওয়ার পর মগবাজার ও আশপাশের এলাকার যানজট নিরসন হয়েছে। তবে এর রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা।

উড়ালসড়কটি নির্মাণ করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ। তবে চালুর পর গত অক্টোবরের শেষ দিকে সেটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে। তবে এই তার চুরির কোনো দায় নিচ্ছে না তারা। আর তার কবে চুরি হয়েছে, সেই বিষয়টিও জানে না তারা। পুলিশের কাছেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।

সরকারি সম্পদ হাতছাড়া হয়ে গেলেও মামলা করেনি সিটি করপোরেশন। আর পুলিশের নিজে থেকেও তদন্তে কোনো আগ্রহ নেই।

ঢাকা মহানগর পুলিশের দক্ষিণের উপকমিশনার (ট্রাফিক) এ এস এম মুরাদ আলী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এই ফ্লাইওভারটি সিটি করপোরেশনের আওতায়। এটি দেখার দায়িত্বও সিটি করপোরেশনের। আমাদের এখতিয়ারে না।’

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। তা ছাড়া এমন কোনো অভিযোগও আমার কাছে আসেনি।’

উড়ালসড়কটিতে বাতি না জ্বলার কারণ দেখতে খুঁটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, নিচে বিদ্যুতের তার নেই। বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, তার টেনে নিতে ঢালাই ভাঙার চেষ্টাও হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। আর টেনে টেনে সব তার খুলে নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, তাদেরকে উড়ালসড়কটি বুঝিয়ে দেওয়া হলেও সেখানে নাগরিক সেবার কী কী আছে, সেই হিসাব দেওয়া হয়নি। আর তারা নিজেরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, বিদ্যুতের তার নেই। বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।

আরেক প্রশ্নে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘গত নভেম্বরের শুরুতে দুই সিটি করপোরেশনের (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ) কাছে এর দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আগে কী হয়েছে সেসব আমরা জানি না। আমাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্যও ছিল না। দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা এসব দেখেছি।’

আপনারা দায়িত্ব নেওয়ার পরও কোথাও কোথাও তার কেটে নিয়ে যাচ্ছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব পেয়েছি অল্প দিন হলো। এ ব্যাপারে শিগগির একটি প্রকল্প চালু করব। পরিচ্ছন্নতাসহ সব বিষয় সেই প্রকল্পের আওতায় চলে আসবে।’

এ বিষয়ে জানতে উড়ালসড়কের দায়িত্বে থাকা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা মেসবাহুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে জানান।

গত জুন মাসে উড়লসড়কটির নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ৫০টি সিসি টিভি ক্যামেরা লাগানো হয়। এর আগে চুরি হয়েছে নাকি ক্যামেরা স্থাপনের পর খুলে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি।

৫০টি সিসি টিভি ক্যামেরা থাকার পরও ক্যাবল চুরির ঘটনা কীভাবে ঘটল, এমন প্রশ্নে ঢাকা মহানগর পুলিশের দক্ষিণের উপকমিশনার (ট্রাফিক) এ এস এম মুরাদ আলী বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে যারা এ কাজের সঙ্গে জড়িত, তাদের ধরতে সক্ষম হয়েছি।’

ঘটছে ছিনতাই

গত ২৪ ডিসেম্বর রাতে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির কর্মকর্তা আক্তার হোসেন, তার বন্ধু মোজাফ্ফর আহমেদ, প্রাণ আরএফএলের কর্মকর্তা ওসমান আহমেদ পুরান ঢাকা থেকে ফিরছিলেন বাড্ডার দিকে। উবারের গাড়ি থামিয়ে পুলিশ পরিচয়ে তিনজনকে নামিয়ে চালককে নিয়ে চলে যায় ছিনতাইকারীরা। পরে তার কাছে যা ছিল সব ছিনিয়ে নেয় তারা।

আক্তার হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার দিকে পুরান ঢাকার বকশীবাজার থেকে বিয়ে খেয়ে উত্তর বাড্ডায় যাচ্ছিলাম। বাংলামোটর দিয়ে ফ্লাইওভারে ওঠার পর রাস্তা ছিল ফাঁকা। ওয়্যারলেস গেটের লুপ দিয়ে ফ্লাইওভারে ওঠার পর পর আমাদের দাঁড়াতে সিগন্যাল দেয়। তারা পুলিশ পরিচয় দিয়ে চালকের কাগজপত্র দেখতে চায়। আমাদের বলে, তার কাগজপত্র নেই। এরপর তাকে থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে যায়। পরে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।’

সংকেত বাতি বিকলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি

এই উড়ালসড়কের ওপর মৌচাক অংশে একটি সিগন্যাল রয়েছে। শান্তিনগর থেকে আসা গাড়িগুলো রামপুরার দিকে নির্বিঘেœ যেতে পারে না। মগবাজার ওয়্যারলেস গেট দিয়ে উঠে মালিবাগের দিকে যাওয়ার সময় এই সিগন্যাল অতিক্রম করতে হয়। উড়ালসড়কটি উদ্বোধনের সময় সেখানে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করতেন। জ্বলত লাল বাতিও। তবে এখন তার কিছুই নেই। তার চুরির পর থেকেই নিভে গেছে লাল-সবুজ বাতি। ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় দুদিক থেকে আসা গাড়িগুলোকে অপর দিক থেকে কেউ আসছে কি না, সেটা দেখে চলতে হয়।

সংকেত বাতি বিকল প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের দক্ষিণের উপকমিশনার (ট্রাফিক) এ এস এম মুরাদ আলী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এখানে সিগন্যাল বাতি না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। আমরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’

তবে কবে নাগাদ এই সিগন্যাল বাতি ঠিক হবে, সে ব্যাপারে কিছু বলতে পারেননি এই পুলিশ কর্মকর্তা।

উৎসঃ   ঢা টা
print

LEAVE A REPLY